হাতে হাতুড়ি, সামনে স্তূপ করা ইট। শরীরজুড়ে ক্লান্তি থাকলেও দুই চোখেমুখে ফুটে ওঠে বেঁচে থাকার এক অদম্য আকুতি। একের পর এক ইটে হাতুড়ির আঘাত করে টুকরো বা খোয়া তৈরি করছেন তিনি। অন্য আট-দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো তার দুটি পা নেই, কিন্তু তাতে কী? থমকে যায়নি তার জীবনের পথচলা। সব ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতাকে জয় করে কঠোর পরিশ্রমে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নিজের পরিবারকে আগলে রেখেছেন সলিম উল্যাহ। তিনি ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের আশ্রাফপুর গ্রামের চাঁন মিয়া ব্যাপারী বাড়ির বাসিন্দা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সলিম উল্যাহ তার দুটি পা হারান। তার পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী এবং এক কন্যাসন্তান; তবে কোনো উপার্জনক্ষম ছেলে সন্তান নেই। চরম অর্থসংকট এবং দৈহিক অক্ষমতা তাকে দমাতে পারেনি। ভিক্ষাবৃত্তির সহজ পথ বেছে না নিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন কায়িক শ্রমের সম্মানজনক পথ। স্ত্রী ও মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে সারাদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ইট ভেঙে যা আয় করেন, তা দিয়েই টেনেটুনে চলে সংসার এবং মেয়ের পড়াশোনার খরচ।

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা সলিম উল্যাহ মুক্তকণ্ঠকে জানান, “সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানোর পর আমি তিন দশক ধরে এই কষ্টদায়ক জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলাফেরা করা আমার জন্য ততটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। দুটি পা না থাকায় এখন আর আগের মতো চলাচল করতে পারি না। অসুস্থতার কারণে শরীর আর সাড়া দেয় না। তবে এই বয়সে ভিক্ষা না করে খেটে খাচ্ছি, এটাই আমার শান্তি। চলাচলের জন্য একটি মোটরচালিত হুইলচেয়ার পেলে আমার প্রতিদিনের কষ্ট অনেক কমে যেত এবং কাজ ও চলাফেরার পথটা একটু সহজ হতো।”

সলিমের মনোবল দেখে মুগ্ধ স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সলিম উল্যাহর জীবনকে কঠিন করলেও তার মনোবলকে দমাতে পারেনি। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই নিরন্তর প্রচেষ্টা সমাজের অনেকের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণা।” বর্তমানে সলিম উল্যাহর কষ্ট লাঘব করতে এবং চলাচলের পথ সহজ করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের কাছে একটি মোটরচালিত হুইলচেয়ারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার। সরকারি বা বেসরকারি কোনো মাধ্যম থেকে একটি মোটরচালিত হুইলচেয়ার পেলে তার অনেক উপকার হতো। সকলের সামান্য সহানুভূতি ও সহযোগিতা পারে এই অদম্য লড়াকু মানুষের জীবনসংগ্রামকে কিছুটা সহজ করতে।

এই বিষয়ে দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, “সলিম উল্যাহ সাহেবের জীবনসংগ্রাম আমাদের সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। অনেকে সুস্থ-সবল শরীর নিয়েও অলস সময় পার করছেন, অথচ উনার দুটি পা না থাকা সত্ত্বেও তিনি জীবনসংগ্রাম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমরা বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওনাকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়ার ব্যবস্থা করব।”