চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের কলাদী এলাকা। সেখানে একটি ভবন নির্মাণ কাজ চলছে। ভবনের নিচতলায় বসে হাতুড়ি দিয়ে ইট ভেঙে খোয়া তৈরির কাজ করছিলেন বিল্লাল খান (৪২)। তাঁর পাশেই রাখা ছিল একজোড়া ক্রাচ, যা তাঁর চলাফেরার একমাত্র অবলম্বন।

গত ২ অক্টোবর বিকেলে বিল্লালের সঙ্গে কথা হয়। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি জানান, মাত্র ১২ বছর বয়সে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর ডান পা হারান। সেই দিন থেকে ক্রাচই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের ভরসা। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁকে দমাতে পারেনি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি ক্রাচে ভর করে দূর-দূরান্তে বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে ইট ভেঙে খোয়া বা সুড়কি তৈরি করছেন। এই কঠোর পরিশ্রমের মজুরিতেই চলে তাঁর পুরো সংসার।

বিল্লালের আদি বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার চৌরাঙ্গা গ্রামে। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। শৈশবেই তিনি বাবাকে হারান। তাঁর বাবা জলিল খান একজন দিনমজুর ছিলেন, যার কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বিল্লালের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।

কাজের ধরন অনুযায়ী তিনি দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। তবে মাসে সব সময় কাজ পাওয়া যায় না, গড়ে ১৫ থেকে ১৬ দিন কাজ মেলে। কাজের সন্ধানে অনেক সময় তাঁকে ক্রাচে ভর করে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হয়।

মসলা গুঁড়া করার মেশিনে হারান পা

পরিবারের অভাব দূর করতে মাত্র ১২ বছর বয়সেই হাজীগঞ্জ উপজেলার একটি বাজারে নানার চায়ের দোকানে কাজ শুরু করেছিলেন বিল্লাল। একদিন কৌতূহলবশত তিনি বাজারের একটি মসলা গুঁড়া করার মেশিনের কাছে যান। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর লুঙ্গি মেশিনের রোলারে আটকে যায় এবং রোলারের প্রবল টানে তাঁর ডান পা ভেঙে যায়। দ্রুত স্বজনরা তাঁকে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়।

চা বিক্রি থেকে ইট ভাঙা

পা হারানোর শোক কাটিয়ে মনোবল হারাননি বিল্লাল। শুরুতে তিনি মামার চায়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে মামার আর্থিক সহায়তায় ফরিদগঞ্জের টোরা মুন্সিরহাট বাজারে তিনি নিজেই একটি চায়ের দোকান দেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় একসময় সেই দোকানটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।

২০০৬ সালের শুরুর দিকে ছেলেকে চিকিৎসক দেখাতে মতলব দক্ষিণে আসেন বিল্লাল। সেই সময়ে তাঁর চায়ের দোকানটি আর ছিল না এবং আয়ের কোনো পথও খোলা ছিল না। তাই তিনি পরিবার নিয়ে এখানেই স্থায়ী হওয়ার কথা ভাবেন, এই আশায় যে এখানে থাকলে অন্তত কিছু আয়ের ব্যবস্থা হবে।

এরপর নবকলস এলাকার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁকে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে হয়। এখানে আসার পর প্রথম দুই বছর তিনি দিনমজুরির কাজ করেছেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বিল্লাল বলেন, সে সময় খেয়ে না–খেয়ে দিন কেটেছে। পরবর্তীতে তিনি ইট ভেঙে খোয়া তৈরির কাজ শুরু করেন।

বিল্লাল জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন তিনি এবং মাসে ১৫ থেকে ১৬ দিন কাজ পান। অনেক সময় কাজের জন্য ক্রাচে ভর করে দুই-তিন কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। এই সামান্য আয়েই তিনি সংসার চালান এবং তাঁর দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।

‘নিজেই গতর খাইটা চলতাছি’

বিল্লালের এই লড়াই দেখে অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, কষ্ট করে কাজ করার প্রয়োজন নেই, বরং মানুষের কাছে হাত পাতলেই জীবন সহজ হবে। কিন্তু বিল্লাল সেই পথ বেছে নেননি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “অনেকে কইছিল, কাম করণের কী দরকার। অন্যের কাছে হাত পাততাম, ভিক্ষা করতাম। কিন্তু কারও কাছে হাত পাততে শরম লাগে। ভিক্ষা করতে ঘৃণা লাগে। এলিগা নিজেই গতর খাইটা চলতাছি।”

তবে বর্তমান আয়ে সংসার চালানো তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল্লাল আক্ষেপ করে বলেন, “বাসাভাড়া দিয়া এই আয়ে কুলায় না। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমারে থাওনের একটা বাড়ি যেন কইরা দেয়।”

বিল্লাল খানের সহকর্মী নবকলস এলাকার বিল্লাল হোসেনও ওই ভবনে কাজ করছিলেন। তিনি জানান, পঙ্গু হয়েও বিল্লাল খান যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছেন, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী।

বিল্লাল খানের এই জীবনসংগ্রামের বিষয়ে খোঁজখবর নেবেন বলে জানিয়েছেন মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শারীরিক বাধা জয় করে বিল্লাল যেভাবে টিকে থাকার লড়াই করছেন, তা বিরল। এরপর প্রশাসন থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।