ইউটিউবের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি শিখে বাড়ির ছাদ, আঙিনা এবং ইজারা নেওয়া জমিতে ড্রাগন ফলের আবাদ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন বিদেশফেরত মো. আবু হানিফ (৬২)। বর্তমানে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ড্রাগন বিক্রি করে বছরে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন তিনি, যা তাঁর সংসারে এনেছে অভাবনীয় সচ্ছলতা।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবু হানিফ। তিনি ওই গ্রামের হাজি মো. সুলতান আহম্মেদ প্রধানের বড় ছেলে এবং দুই সন্তানের বাবা। মতলব দক্ষিণ উপজেলার মধ্য কলাদী এলাকায় তাঁর একটি একতলা বাড়ি রয়েছে। এই বাড়ির ছাদে এবং আঙিনায় তিনি ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। এছাড়া চলতি মৌসুমে উপজেলার পৈলপাড়া এলাকায় জমি ইজারা নিয়ে সেখানেও ড্রাগন চাষ করেছেন তিনি।
স্থানীয় বাজারে হানিফের উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। তাঁর বাগানটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে অনেকে ‘ড্রাগনের রাজ্য’ বলে অভিহিত করেন। এই সাফল্যের কারণে এলাকায় তিনি এখন ‘ড্রাগন হানিফ’ নামে পরিচিত এবং তাঁর ফল আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায়ও সরবরাহ করা হচ্ছে।
আবু হানিফের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ চৈতন্য পাল। তিনি বলেন, “বয়সকে হার মানিয়ে ওই ব্যক্তি যেভাবে একক প্রচেষ্টায় তাঁর ছাদবাগান ও আঙিনায় ড্রাগনের ‘মিনি রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন, তা তাঁর অদম্য মনের পরিচায়ক। তিনি দৃষ্টান্ত। কৃষি কার্যালয় থেকে তাঁকে সার্বিকভাবে পরামর্শ দেওয়া হবে।”
গত ৪ অক্টোবর মধ্য কলাদী এলাকায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আবু হানিফ অত্যন্ত যত্ন সহকারে তাঁর ছাদবাগান ও আঙিনার ড্রাগন গাছগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত। সেখানে আলাপকালে তিনি তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা জানান। তিনি বলেন, “সংসারের হাল ধরতে ১৯৮২ সালে এইচসসি পাসের পর দরজির দোকান দেন। এ কাজে তেমন আয় না হওয়ায় সংসারের সচ্ছলতা আনতে ১৯৮৭ সালে পাড়ি জমান বাহরাইনে। সেখানে যা আয় করতেন তা দিয়ে সংসার চলত। ২০১২ সালে দেশে ফেরেন। শুরু করেন বিভিন্ন কোম্পানির মালামাল বিতরণের (ডিস্ট্রিবিউশন) ব্যবসা। এতেও আর্থিকভাবে সুবিধা হয়নি।”
প্রবাস থেকে ফিরে তিনি মধ্য কলাদী এলাকায় সড়কের পাশে কিছু জায়গা কিনে একটি একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। এরপর ইউটিউব থেকে ড্রাগন চাষের কৌশল শিখে ২০২৪ সালে বাড়ির ১ হাজার ৪০০ বর্গফুট ছাদে এবং সাড়ে ৬ শতক আঙিনায় উন্নত জাতের ড্রাগন রোপণ করেন। প্রথম বছরেই উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তিনি অর্ধলক্ষাধিক টাকা লাভ করেন। ২০২৫ সালে ড্রাগন বিক্রি করে তাঁর লাভ এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৬ সালেও তিনি এক লাখ টাকার বেশি লাভ করেন। বছরে তিনবার এই গাছে ফলন হয় বলে তাঁর আয় নিয়মিত থাকে।
চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে হানিফ জানান, তিনি বাগানে জৈব সারের পাশাপাশি কিছু রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন, তবে কোনো কীটনাশক ছিটান না। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তিনি আত্মীয়স্বজনদেরও এই ফল খেতে দেন। স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভ দেখে তিনি পৈলপাড়া এলাকায় আরও ৬০ শতক জমি ইজারা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪০ শতক জমিতে ড্রাগন এবং বাকি ২০ শতক জমিতে আঙুর, পেঁপে ও কলার আবাদ করেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, “বাগানে আমার বড় ছেলেও সময় দেয়। সহযোগিতা করে। শখে ড্রাগনের বাগান করেছিলাম। এখন ড্রাগন বিক্রি করে আয় হচ্ছে। সংসারের সচ্ছলতা বাড়ছে। আরও বড় আকারে এর চাষ করব। বাকি উপরওয়ালার ইচ্ছা।”