চলতি বছরের ব্যালন ডি’অর জয় করেছেন ইংলিশ ফুটবল তারকা হ্যারি কেইন। তবে এই অনন্য সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে কৈশোরের অনেক বাধা, বিপত্তি এবং গভীর সংশয়ের গল্প। প্লেয়ারস ট্রিবিউন-এ প্রকাশিত তাঁর একটি লেখার নির্বাচিত অংশের অনুবাদে উঠে এসেছে সেই জীবনযুদ্ধের কথা।
শৈশবে ‘ব্যর্থতা’ শব্দটির অর্থ তাঁর কাছে ছিল বেশ রহস্যময়। কেইন স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাদের চিংফোর্ডের বাড়ির ঠিক পেছনেই একটি পার্ক ছিল। সেখানে বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে প্রায়ই ফুটবল খেলতে যেতেন তিনি। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট মাঠ বা গোলপোস্ট ছিল না; সামান্য কিছু ঘাস আর দুটি গাছ থাকলেই তাদের ফুটবল খেলার আনন্দ পূর্ণ হতো। আট বছর বয়সে তিনি আর্সেনালের যুব দলে খেলতেন। একদিন বাবার সঙ্গে পার্কে যাওয়ার সময় হঠাৎ বাবা কথা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’
হ্যারি কেইন সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করে লিখেছেন, “মনে আছে, এরপর বাবা কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ‘শোনো হ্যারি, আর্সেনাল তোমাকে আর দলে রাখছে না।’”
সেই মুহূর্তে তাঁর মনে ঠিক কী অনুভূতি হয়েছিল, তা তিনি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন না। বয়সের কারণে হয়তো সেই কথাটির গভীরতাও তিনি তখন বুঝতে পারেননি। তবে বাবার প্রতিক্রিয়া তাঁর মনে গেঁথে আছে। বাবা তাঁকে বা আর্সেনাল ক্লাবকে কোনোভাবেই দোষারোপ করেননি এবং খুব একটা বিচলিত হয়েও পড়েননি। বরং তিনি আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “চিন্তা কোরো না, হ্যারি। আমরা আরও পরিশ্রম করব। সামনে এগিয়ে যাব। অন্য কোনো ক্লাব খুঁজে নেব। ঠিক আছে?”
এখন পেছন ফিরে তাকালে কেইনের মনে হয়, তাঁর আরও বেশি ভেঙে পড়ার কথা ছিল। সাধারণত যেসব বাবা সন্তানের পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই ছেলের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেননি, বরং সব সময় ইতিবাচক থেকে শুধু একটি কথাই বলতেন, “তো চলো, কাজে নেমে পড়ি।”
আর্সেনাল থেকে ছাঁটাই হওয়ার পর কিছুদিন বিভিন্ন জায়গায় খেলে নিজের এলাকার ক্লাবে ফিরে আসেন কেইন। সেখান থেকেই তাঁর ভাগ্য বদলে যায় যখন ওয়াটফোর্ডের এক স্কাউটের নজরে পড়েন তিনি। স্কাউটের আমন্ত্রণে ট্রায়ালে অংশ নেন তিনি। কেইনের মতে, জীবন কীভাবে মোড় নেয়, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। ওয়াটফোর্ডের হয়ে টটেনহামের বিপক্ষে খেলার পর তিনি টটেনহামের যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। পরবর্তীতে যখন প্রথমবার আর্সেনালের বিপক্ষে খেলতে নামেন, তখন তাঁর ভেতরে এক তীব্র জেদ কাজ করছিল। তিনি মনে মনে বলতেন, “বটে! এবার দেখা যাবে কে পারে আর কে পারে না।”
পরবর্তীতে ডেন স্টেডিয়ামে তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি ম্যাচের কথা মনে পড়ে তাঁর। রেফারি একটি ভুল সিদ্ধান্ত দেওয়ার ফলে দর্শকরা উত্তেজিত হয়ে মাঠের ভেতর নানা জিনিস ছুড়ে মারতে শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দর্শকদের শান্ত করতে পাঁচ মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রাখতে হয়। তখন ১৮ বছর বয়সী কেইনের কাছে পুরো বিষয়টি ছিল অবিশ্বাস্য।
মৌসুম যত এগোচ্ছিল, দলের পারফরম্যান্স তত খারাপ হচ্ছিল। ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলছিলেন, “যদি আরও নিচে নামি, আমাদের বেতন অর্ধেক হয়ে যাবে।” আবার কেউ বলছিলেন, “এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় গেলে আমার চুক্তিই বাতিল হয়ে যাবে।” সতীর্থদের অনেকেরই ছোট সন্তান ছিল। এই পরিস্থিতি কেইনকে উপলব্ধি করাল যে, ফুটবল কেবল আনন্দের খেলা নয়, বরং অনেকের পরিবারের জীবিকা ও ভরণপোষণের একমাত্র উৎস। তিনি বুঝতে পারলেন, ফুটবল ক্যারিয়ার কতটা অনিশ্চিত এবং মুহূর্তের ভুলে সব অর্জন হারিয়ে যেতে পারে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর শিশুসুলভ ভাবনাগুলোকে মুছে দেয়।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়টি তিনি অতিবাহিত করেন লেস্টার সিটিতে। সেখানে মূল দলে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। চরম হতাশ হয়ে তিনি বাবাকে জানান যে তিনি ক্লাব ছেড়ে চলে যেতে চান। তখন বাবা তাঁকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, “দেখো, পরিশ্রম করে যাও। কাজ চালিয়ে যাও। সামনে এগোও। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কয়েক সপ্তাহ পর নিজের ফ্ল্যাটে বসে থাকাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগ বা এনএফএল-এর প্রতি কেইনের আগ্রহ তৈরি হয়। সেই সময়েই তিনি টম ব্র্যাডির একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন, যা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় মানুষ ব্র্যাডির সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ করেছে। এমনকি কলেজের কোচেরা তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। এনএফএল ড্রাফটের আগের একটি ছবিতে ব্র্যাডিকে রোগা-পাতলা দেখাচ্ছিল এবং একজন কোচ মন্তব্য করেছিলেন, “ও বেশ লম্বা, রোগা–পাতলা। দেখে মনে হয়, জীবনে কখনো জিমেও যায়নি।”
ব্র্যাডির এই লড়াইয়ের মধ্যে কেইন নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান। কারণ তাঁকে নিয়েও মানুষ বলত, “ওকে দেখে তো স্ট্রাইকার মনেই হয় না।” ব্র্যাডির অগাধ আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম কেইনকে অনুপ্রাণিত করে। লেস্টারের সোফায় বসে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন, “আমি পারব। যতটা সম্ভব কঠোর পরিশ্রম করব। সুযোগ একদিন আসবেই। আর সেই সুযোগ আমি কাজে লাগাব।”
এর কিছু ম্যাচ পর সাবেক ক্লাব মিলওয়ালের বিপক্ষে খেলতে নামেন তিনি। প্রতিপক্ষের এক দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডার তাঁকে ভয় দেখানোর জন্য বলেন, “এই যে হ্যারি, আমি কিন্তু এখনো কোনো হলুদ কার্ড পাইনি।” কেইন পাল্টা প্রশ্ন করেন, “...আচ্ছা, তো?” ডিফেন্ডারটি উত্তর দেন, “না মানে...তোমাকে দিয়েই প্রথম হলুদ কার্ডটা পাওয়ার কথা ভাবছি কি না...”
একটি থ্রো-ইন থেকে বল আসার পর দুজনই হেডের জন্য লাফ দেন। সেই লড়াইয়ে দুর্ঘটনাবশত কেইনের কনুই ডিফেন্ডারের পাঁজরে লাগে এবং সে ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কেইন তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যান। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে এবং সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে, তিনি আর কারও চোখ রাঙানি বা ভয়ভীতিতে দমে যাওয়ার মানুষ নন।