ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে এবার সেরার মুকুট জিততে পারেননি লিওনেল মেসি। তবে ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের ভোটাভুটিতে মোট ছয়টি দেশের সাংবাদিক তাকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। অবাক করা বিষয় হলো, এই তালিকায় আর্জেন্টিনার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলও। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসি সামগ্রিক পয়েন্টের হিসেবে পঞ্চম স্থানে থাকলেও, তাকে তালিকার শীর্ষে রাখা একজন ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকের সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জনপ্রিয় ফরাসি সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল এবারের ব্যালন ডি’অরের ভোটের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্যানুসারে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পানামা, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং চীনের প্রতিনিধিরা মেসিকে প্রথম স্থানে রেখেছেন। প্রতিটি প্রথম স্থানের ভোট থেকে ১৫ পয়েন্ট করে মোট ৯০ পয়েন্ট অর্জন করেছেন ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক। অন্যান্য সাংবাদিকদের দেওয়া ভোট মিলিয়ে তার মোট পয়েন্টের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৬১২।

এবারের ভোটাভুটিতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন ব্রাজিলের প্রতিনিধি ক্লেবের মাশাদু। ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত প্রাচীন এবং তীব্র। দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নিয়মিত ঘটনা। তবে ব্যক্তিগত ও পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গুরুত্ব না দিয়ে আর্জেন্টাইন তারকাকেই বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান ধারাভাষ্যকার।

ব্রাজিলের টিভি রেকর্ডের ধারাভাষ্যকার মাশাদু ২০০৭ সাল থেকে ব্যালন ডি’অরের ভোটে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। এবারের তালিকায় মেসিকে প্রথম স্থানে রাখার পাশাপাশি দ্বিতীয় স্থানে রেখেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। তৃতীয় স্থানে তার পছন্দে রয়েছেন স্পেনের রদ্রি। অন্যদিকে, ব্যালন ডি’অরজয়ী হ্যারি কেইনকে চতুর্থ স্থানে রেখেছেন তিনি। তবে ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অবস্থান তার তালিকায় অষ্টম।

মেসিকে প্রথম স্থানে রাখার পেছনে তার যুক্তি ব্যাখ্যা করেছেন মাশাদু। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ওলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ভোট দেওয়ার সময় তিনি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বিবেচনায় নেননি। বরং মাঠের পারফরম্যান্স এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফুটবলারদের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করেছেন।

মাশাদুর মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে সেরা দুই ফুটবলার ছিলেন মেসি ও এমবাপ্পে। ফরাসি ফরোয়ার্ডের নৈপুণ্যের প্রশংসা করলেও মেসির নেতৃত্ব এবং আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদানকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

মাশাদু বলেন, “প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাশে রাখতে হবে। আমার মতে, বিশ্বকাপে সেরা দুই ফুটবলার ছিলেন মেসি ও এমবাপ্পে। ফরাসি তারকা অসাধারণ খেলেছে। তবে গত ১৫ বছর ধরে মেসিই বিশ্বের সেরা ফুটবলার। ৩৯ বছর বয়সেও নিজের প্রতিভা এবং ম্যাচের ফল নির্ধারণের সামর্থ্য আবার দেখিয়েছেন তিনি।”

কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মেসির অসাধারণ ক্ষমতা ব্রাজিলিয়ান এই সাংবাদিককে মুগ্ধ করেছে। তার মতে, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখনই বিপদে পড়েছে, তখনই দায়িত্ব নিয়ে সামনে থেকে দলকে পথ দেখিয়েছেন মেসি। বিশেষ করে ডান প্রান্ত থেকে আক্রমণ সাজিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়েছেন তিনি।

মাশাদুর ভাষায়, “খেলার বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে আমার কাছে মেসিই সেরা। আর্জেন্টিনা অনেক কঠিন মুহূর্ত পার করেছে। তখন মেসি ডান প্রান্তে গিয়ে প্রতিপক্ষের গোলমুখে আক্রমণ সাজাতেন এবং কয়েকটি মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতেন। অনেকটাই তার কারণেই আর্জেন্টিনা আবার ফাইনালে উঠেছে। সে জন্যই আমি মেসিকে ভোট দিয়েছি।”

উল্লেখ্য যে, ব্যালন ডি’অরের ভোটে মেসিকে সবার ওপরে রাখা মাশাদুর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০২৩ সালেও তিনি আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে প্রথম স্থানে রেখেছিলেন, যে বছর রেকর্ড অষ্টমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন মেসি। তিন বছর পর আবারও তার ওপর আস্থা রাখলেন এই ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক।

তবে ছয় সাংবাদিকের প্রথম পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও এবার পুরস্কার জিততে পারেননি মেসি। মোট ৬১২ পয়েন্ট নিয়ে তাকে সন্তুষ্ট হতে হয়েছে পঞ্চম স্থানে। তার ওপরে অবস্থান করছেন হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল ও রদ্রি।

বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫ পয়েন্ট অর্জন করে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে দ্বিতীয় হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এমবাপ্পে। বার্সেলোনার ইয়ামাল ৮৮১ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় এবং ৭২৬ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ হয়েছেন রদ্রি।

প্রথম স্থানের ভোটের হিসেবেও সবার ওপরে ছিলেন কেইন। বিশ্বের ১০০ জন নির্বাচিত সাংবাদিকের মধ্যে ৪০ জন তাকে প্রথম স্থানে রেখেছেন। এমবাপ্পে পেয়েছেন ২৩টি প্রথম স্থানের ভোট। ইয়ামালকে সেরা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১৩ জন এবং রদ্রিকে ১০ জন। সেখানে মেসিকে প্রথম স্থানে রেখেছেন ছয়জন সাংবাদিক।

ব্যালন ডি’অরের নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের বিভাগে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে নির্বাচিত সাংবাদিক ভোট দেন। প্রত্যেকে ৩০ জন মনোনীত ফুটবলারের মধ্য থেকে সেরা ১০ জনকে বেছে নেন। প্রথম স্থানের জন্য দেওয়া হয় ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় স্থানের জন্য ১২ এবং তৃতীয় স্থানের জন্য ১০ পয়েন্ট। এরপর পর্যায়ক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেওয়া হয়।

গত মৌসুমে ইন্টার মায়ামির হয়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও তুলেছিলেন মেসি। যদিও শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের কাছে হেরে যায় তাঁর দল। বিশ্বকাপ ও ক্লাব ফুটবলের এই পারফরম্যান্সের সুবাদে এবারও ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত নবম ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি মেসির। তবে নিজ দেশের পাশাপাশি ব্রাজিলসহ আরও পাঁচ দেশের সাংবাদিকের প্রথম পছন্দ হওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবল বিশেষজ্ঞদের কাছে তিনি এখনও সেরার দাবিদার।