সময় বড়ই নিষ্ঠুর। যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে একসময় গোটা ফুটবল বিশ্বকে নিজের পায়ের কাছে এনেছিলেন, সেই মঞ্চের আকর্ষণ এখন আর আগের মতো নেই, সেখানে ফেরার আগ্রহও কমেছে। লিওনেল মেসির কথা ধরা যাক। ব্যালন ডি’অরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রায় দুই দশকের। ফুটবল ইতিহাসের অনন্য রেকর্ড গড়ে আটবার এই পুরস্কার জিতেছেন তিনি। তবে এবারের ব্যালন ডি’অরের মূল মঞ্চে তাঁর জায়গা হয়নি, যদিও বিশ্বের সেরা পাঁচ ফুটবলারের তালিকায় তিনি ঠিকই থেকেছেন।

৩৯ বছর বয়সে এসে ইউরোপীয় ফুটবল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পাড়ি জমানোর পরও বিশ্বের পঞ্চম সেরা ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

গত রাতে লন্ডনে অনুষ্ঠিত জমকালো অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয় করেছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ইংল্যান্ডের জন্য এই গৌরব বয়ে আনলেন তিনি। এর আগে সর্বশেষ ২০০১ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন মাইকেল ওয়েন। কেইনের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। চতুর্থ হয়েছেন তাঁর বার্সেলোনা ও স্পেন সতীর্থ রদ্রি। আর তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছেন লিওনেল মেসি।

আসলে এই অর্জনও ছোট কিছু নয়। যে বয়সে অনেক ফুটবলার কোচিং ক্যারিয়ারের পরিকল্পনা করেন, টেলিভিশনে খেলা বিশ্লেষণ করেন কিংবা অবসরের আরাম খোঁজেন, সেই বয়সে মেসি এখনো বিশ্বের সেরা পাঁচের একজন। এই সাফল্যের রহস্য খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে। মেসির জাদুকরী খেলায় ইন্টার মায়ামি জয় করেছিল এমএলএস কাপ। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে নিজের আধিপত্য কায়েমের পর আর্জেন্টিনার জার্সিতেও পুরোনো সেই জাদু দেখিয়েছেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে গেছেন মেসি। আট ম্যাচে ৮ গোল এবং ৪টি গোলে সহায়তা করে মোট ১২টি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন তিনি। তবে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল পান রদ্রি এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট জেতেন এমবাপ্পে। এই দুটি পুরস্কারেই দ্বিতীয় হয়ে সিলভার বল ও সিলভার বুট জিতেছেন মেসি। মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্বকাপের সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর!

এরপর ব্যালন ডি’অরের ভোটাভুটিতে মেসি পেছনে ফেলেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী পিএসজির দুই তারকা খিচা কাভারাস্কেইয়া ও উসমান দেম্বেলেকে। এছাড়া তালিকায় পেছনে পড়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ড, বায়ার্নের মাইকেল ওলিসে এবং পিএসজির ফাবিয়ান রুইজও। তবে এই পঞ্চম স্থানে থাকা নিয়ে মেসির খুব একটা মন খারাপ হওয়ার কথা নয়। আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ী এক কিংবদন্তির কাছে পঞ্চম হওয়ার আনন্দ হয়তো খুব একটা বেশি নয়। সেটির একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সোমবারই।

লন্ডনের সেই জমকালো অনুষ্ঠানে মেসি উপস্থিত ছিলেন না। কেন যাননি, সে বিষয়ে তিনি নিজে কিছু জানাননি। তবে পুরস্কার জেতার সম্ভাবনা কম ছিল বলে তিনি হয়তো তা বুঝেছিলেন। পাশাপাশি মঙ্গলবার ইন্টার মায়ামির এমএলএস ম্যাচ থাকায় শুধু অনুষ্ঠানের জন্য আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার তেমন যুক্তি ছিল না তাঁর কাছে।

মেসি বরং বেছে নিলেন ভিন্ন এক মঞ্চ। মায়ামিতে অনুষ্ঠিত 'মেসি কাপ'-এর দ্বিতীয় আসরে হাজির হলেন তিনি। অনূর্ধ্ব-১৬ বছর বয়সী ফুটবলারদের এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের সেরা ১৬টি দল অংশ নিচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে চলবে আগামীর তারকাদের এই লড়াই। লন্ডনে যখন বর্তমান তারকাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছিল, মেসি তখন সময় কাটাচ্ছিলেন ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকাদের সঙ্গে। একদিকে ১৯ বছরের ইয়ামাল যখন ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে উঠে আসছেন, অন্যদিকে ৩৯ বছরের মেসি দেখছেন আগামী দিনের ইয়ামালদের।

পুরো তালিকাটি নিম্নরূপ:
১. হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ, ইংল্যান্ড)
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে (রিয়াল মাদ্রিদ, ফ্রান্স)
৩. লামিনে ইয়ামাল (বার্সেলোনা, স্পেন)
৪. রদ্রি (বার্সেলোনা, স্পেন)
৫. লিওনেল মেসি (ইন্টার মায়ামি, আর্জেন্টিনা)
৬. খিচা কাভারাস্কেইয়া (পিএসজি, জর্জিয়া)
৭. উসমান দেম্বেলে (পিএসজি, ফ্রান্স)
৮. আর্লিং হলান্ড (ম্যানচেস্টার সিটি, নরওয়ে)
৯. মাইকেল ওলিসে (বায়ার্ন মিউনিখ, ফ্রান্স)
১০. ফাবিয়ান রুইজ (পিএসজি, স্পেন)
১১. জুড বেলিংহাম (রিয়াল মাদ্রিদ, ইংল্যান্ড)
১২. পাউ কুবারসি (বার্সেলোনা, স্পেন)
১৩. আশরাফ হাকিমি (পিএসজি, মরক্কো)
১৪. ভিতিনিয়া (পিএসজি, পর্তুগাল)
১৫. ডেকলান রাইস (আর্সেনাল, ইংল্যান্ড)
১৬. ফেরান তোরেস (পিএসজি, স্পেন)
১৭. ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (রিয়াল মাদ্রিদ, ব্রাজিল)
১৮. মার্ক কুকুরেয়া (রিয়াল মাদ্রিদ, স্পেন)
১৯. জোয়াও নেভেস (পিএসজি, পর্তুগাল)
২০. উইলিয়ান পাচো (পিএসজি, ইকুয়েডর)
২১. গ্যাব্রিয়েল (আর্সেনাল, ব্রাজিল)
২২. লাওতারো মার্তিনেজ (ইন্টার মিলান, আর্জেন্টিনা)
২৩. নুনো মেন্দেস (পিএসজি, পর্তুগাল)
২৪. লুইস দিয়াজ (বায়ার্ন মিউনিখ, কলম্বিয়া)
২৫. মার্কিনিওস (পিএসজি, ব্রাজিল)
২৬. দায়োত উপামেকানো (বায়ার্ন মিউনিখ, ফ্রান্স)
২৭. ব্রুনো ফার্নান্দেজ (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, পর্তুগাল)
২৮. হুলিয়ান কিনিয়োনেস (কাদসিয়া, মেক্সিকো)
২৯. সাদিও মানে (আল নাসর, সেনেগাল)*
*২৯. উইলিয়াম সালিবা (আর্সেনাল, ফ্রান্স)*
(* সমান ভোট)