পারিবারিক অভাব আর জীবনযুদ্ধের গল্প নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন মজিবুর রহমান (৫৯)। তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা এখন অনেকের মুখে মুখে। সকালে দিনমজুরি আর বিকেলে রিকশা চালানোর মাধ্যমে অতি কষ্টে তাঁর সংসার চলে।

মজিবুর রহমানের পৈতৃক নিবাস চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়া গ্রামে। তিনি মৃত ইউনুস পাটোয়ারী ও মৃত খাতুনেয়ার বেগম দম্পতির সন্তান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মজিবুর সবার বড়। বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। প্রায় ১৯ বছর আগে, ২০০৭ সালে তিনি মতলব উত্তর থেকে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় স্থানান্তরিত হন এবং কলাদী এলাকায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।

জীবনযুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারান মজিবুর। তখন সংসারের হাল ধরতে তিনি কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে কৃষিকাজে আশানুরূপ আয় না হওয়ায় তিনি ঠেলাগাড়ি চালানোর পেশায় যোগ দেন। সেখানেও যখন অভাব দূর হলো না, তখন ১৯৯১ সাল থেকে তিনি রিকশা চালানো শুরু করেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত রিকশা চালিয়েই টেনেটুনে সংসার চালিয়েছেন তিনি। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সংসারে সচ্ছলতা আনতে ২০০৭ সাল থেকে রিকশা চালানোর পাশাপাশি দিনমজুরি শুরু করেন তিনি।

গত রোববার বেলা ১১টায় মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের টিঅ্যান্ডটি এলাকায় দিনমজুরি করার সময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মজিবুর রহমানের। তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পর তাঁর মা-ও মারা যান। বাবার কোনো সহায়সম্পদ ছিল না বলে কিশোর বয়সেই তাঁকে কৃষিশ্রমিকের কাজ নিতে হয়েছিল। কিন্তু সেই আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরপর কয়েক বছর ঠেলাগাড়িতে করে মানুষের মালপত্র আনা-নেওয়ার কাজ করেন। পেশা বদল করেও যখন অভাব দূর হলো না, তখন ১৯৯১ সালে রিকশায় বসেন তিনি। মতলব উত্তরে রিকশা চালিয়ে তেমন আয় না হওয়ায় ২০০৭ সালে তিনি মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরে চলে আসেন। আয়ের পথ বাড়াতে তিনি এখন দ্বৈত পেশায় নিয়োজিত। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিনমজুরি করেন এবং বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত রিকশা চালান। এই দুই পেশা মিলিয়ে মাসে তাঁর আয় হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এর মধ্যে তিন হাজার টাকা চলে যায় বাসাভাড়া হিসেবে।

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বর্ণনা করে শ্রমজীবী মজিবুর বলেন, ‘বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম বেশি। যা রুজি করি, তা দিয়া টাইনাটুইনা সংসার চালাই। সংসারের সচ্ছলতা আনতে দুই রহম কাম করি। অনেক কষ্ট অয়। বয়স অইছে। বাসাভাড়া দিয়া, সওদাপত্র কিন্না হাতে তেমন কিছু থায়ে না। গতর খাইটা চলি, এতেই শান্তি। হাত পাতনের চেয়ে কাম কইরা খাওনই ভালা।’

মজিবুরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দিনমজুরি করছেন মো. আলামিন ও নুরুল ইসলাম। আলামিনের বাড়ি উপজেলার মধ্য দিঘলদী গ্রামে এবং নুরুল ইসলামের বাড়ি লাকশিবপুর গ্রামে। মজিবুরের কঠোর পরিশ্রম ও মানসিকতা সম্পর্কে তাঁদের মূল্যায়ন, ‘সংসারের লইগা মজিব ভাই দিনরাইত খাটতাছেন। এক বেলা শ্রমিকগিরি কইরা আরেক বেলা রিকশা চালাইতাছেন। একজনের দুই কাম করা কঠিন; কিন্তু তিনি করতাছেন। মনের জোরে করতাছেন।’

মজিবুর রহমানের এই জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পেরেছেন মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মজিবুরের বিষয়ে জেনেছেন। তিনি সংসারজীবনের এক লড়াকু যোদ্ধা। তাঁর এ হার না–মানা মানসিকতা প্রশংসার দাবি রাখে।