আড়াই মাস কাঠমিস্ত্রির কাজ, খুনের মামলায় দীর্ঘ সাত বছর কারাবাস এবং এরপর চিকিৎসক হয়ে ওঠা—জীবন যেন এক বিস্ময়কর পরিক্রমা। এর পাশাপাশি ৭২ বছর বয়সে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাজশাহীর শরীফ আহমেদ খান। তাঁর জীবনের এই অভাবনীয় সব বাঁকবদলের গল্প তুলে ধরেছেন আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ।
শৈশবে রাজশাহীর হাই মাদ্রাসায় (বর্তমান হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চবিদ্যালয়) পড়াশোনা শুরু করেছিলেন শরীফ আহমেদ খান। তবে পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরীক্ষায় তিনি তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হন। তাঁর বাবা এমদাদ আলী খান, যিনি পেশায় একজন ডাকপিয়ন ছিলেন, অত্যন্ত কঠোর মানুষ ছিলেন। ছেলের ফলাফল দেখে তিনি শরীফকে কাঠমিস্ত্রির কাজে লাগিয়ে দেন। টানা আড়াই মাস এই কাজ করার পর একদিন আকস্মিকভাবে পায়ে একটি পেরেক ঢুকে যায় তাঁর। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতর হয়ে শিশু শরীফ বাবার কাছে গিয়ে কেঁদেকেটে বললেন, ‘বাবা, কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে পারব না। এখন থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করব।’
ছেলের আকুতি শুনে বাবা পুনরায় তাঁকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন এবং পড়াশোনার ঘাটতি পূরণের জন্য একজন গৃহশিক্ষক নিয়োগ করেন। এরপরই শরীফের জীবনে আসে পরিবর্তন, তিনি চমৎকার ফলাফল করতে শুরু করেন। মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করার পর তিনি বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। সময়টি ছিল ১৯৭২ সাল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিজ্ঞান বিভাগেও তিনি ভালো ফল করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগে দুই বছর (১৯৭৪-৭৬ সাল) পড়াশোনা করার পর তাঁর মনে প্রবল ইচ্ছা জাগে চিকিৎসক হওয়ার। সেই লক্ষ্যেই তিনি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সুযোগ পান।
ঠিক এই সময়েই তাঁর পরিবারে একটি নতুন সদস্যের আগমন ঘটে, যার ফলে তাঁরা ১০ ভাই-বোন হন। তবে দশম সন্তানের জন্ম নিয়ে মা রোকেয়া বেগম ও বাবার মধ্যে চরম মতবিরোধ তৈরি হয়। বিবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান।
দশটি সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন মা রোকেয়া বেগম। এরই মধ্যে ছোট ভাইটি জন্মের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সেই কঠিন সময়ে শরীফের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হয়নি এবং মেডিকেল কলেজে সুযোগ পেলেও ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। সংসারের হাল ধরার মতো কোনো পেশা তখন তাঁর হাতে ছিল না।
এমন সংকটময় মুহূর্তে তাঁর পিঠাপিঠি ছোট ভাই ডাকপিয়নের চাকরি পেয়ে সংসারের দায়িত্ব নেন। আর মা তাঁর ছেলেকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘বাবা শরীফ, তোকে ডাক্তার হতেই হবে।’ ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে মা তাঁর একমাত্র সম্বল কানের সোনার দুলজোড়া বিক্রি করে দেন। সেই অর্থ দিয়েই শরীফ আহমেদ খান মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন। তবে মাস ছয়েক পর বাবা নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় সংসারে ফিরে আসেন এবং কিছুদিন পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে থাকেনন।
কিন্তু ভাগ্যে বড় বিপর্যয় তখনও বাকি ছিল। ১৯৭৮ সালে পাঁচ বন্ধু মিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন শরীফ ও তাঁর সঙ্গীরা। ফেরার পথে একজনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি থেকে গণ্ডগোল শুরু হয়। যদিও এলাকার লোকজন এসে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছিল, কিন্তু সেই রাতেই ওই যুবকটি খুন হয়। এই ঘটনার সূত্র ধরে শরীফ খানকে প্রধান আসামি করা হয়। এরশাদ সরকারের আমলে মার্শাল ল কোর্টে তাঁর বিচার শুরু হয়। মামলার প্রবল চাপে এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিলেও মাত্র এক বিষয়ে পাস করেন তিনি, বাকি তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হন।
সামরিক আদালতের রায়ে ১৯৮৪ সালে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। এর আগেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর সন্তান জন্ম নিয়েছিল। তবে এমবিবিএসের বাকি তিন বিষয়ের পরীক্ষা তখনো বাকি রয়ে গেল। শরীফের ভাষায়, তাঁর আর মানুষের মর্যাদা থাকল না। কারাগারের একটি সংখ্যায় পরিণত হলেন—৪৫৩৩। গুনতির সময় এই সংখ্যাতেই ডাকা হতো।
কারাগারের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। ঘুমানোর জন্য সামান্য জায়গা আর দুটি কম্বল, খাওয়ার জন্য ছিল মাত্র থালা-বাটি। পানি খাওয়ার জন্য কোনো গ্লাস ছিল না। গাদাগাদি করে থাকার কারণে তাঁর শরীরে কুষ্ঠ রোগ দেখা দেয়। মনে হয়েছিল, জীবন যেন সব শেষ হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়ে একজন কর্নেল কারাগার পরিদর্শনে এসে শরীফের কথা শুনে তাঁকে বলেন, ‘এটাকে জীবনের একটা অংশ মনে করো। তাহলেই আর খারাপ লাগবে না।’
এই উপদেশটি শরীফের জীবনে মন্ত্রের মতো কাজ করে। তিনি বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হন। বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষার বই পড়ার জন্য তিনি উর্দু ভাষা শেখেন এবং বইয়ের জগতে ডুবে যান।
পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে স্বয়ং এরশাদ কারাগারে যান। এর ফলে মার্শাল ল কোর্টের দণ্ড বাতিল হয়ে যায় এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মুক্তি পান। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন শরীফ খান।
শরীফ আহমেদ খান বলেন, ‘যিনি খুন হয়েছিলেন, তিনি কুখ্যাত সন্ত্রাসী। প্রতিপক্ষের লোকেরাই তাঁকে খুন করেছিল। সিনেমা দেখে ফেরার পথে তাঁদের সঙ্গে আমার গন্ডগোল হয়েছিল, তবে মীমাংসাও হয়ে গিয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে ওই রাতেই তিনি খুন হওয়ায় আমাকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়। মার্শাল ল কোর্টে একতরফাভাবে আমাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই রায় বাতিল হয়ে যায়।’
১৯৯১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁর এমবিবিএস ফাইনালের বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়ার কথা ছিল। তবে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তির পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। বিষয়টি সিন্ডিকেটের সভায় উত্থাপিত হলে দেখা যায় যে, পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একাডেমিক বাধা নেই।
অবশেষে বাকি পরীক্ষাগুলো দিয়ে পাস করেন শরীফ আহমেদ খান এবং ১৯৯১ সালে তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হয়। তবে ততদিনে জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি বেসরকারি চাকরি এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে তাঁর পেশাগত জীবন অতিবাহিত করেন। পরবর্তীতে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে চিকিৎসক হিসেবে অবসর নেন তিনি।
বর্তমানে ডাক্তার শরীফ আহমেদ খানের বয়স ৭৪ বছর। তিনি রাজশাহী নগরের শেখপাড়া মহল্লায় বসবাস করেন। তাঁর এই অসম লড়াই ও জীবনসংগ্রাম নিয়ে তিনি একটি আত্মজীবনী লিখেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ’।
চিকিৎসকের পাশাপাশি শরীফ আহমেদ খানের আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি গান লেখেন ও সুর করেন। ৭২ বছর বয়সে বেতারের অডিশন দিয়ে তিনি নিয়মিত আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। সাত বছরের কারাবাসের সেই দুঃসহ স্মৃতি তাঁর গানের কথায় ফুটে ওঠে। তাঁর লেখা গানের কয়েকটি লাইন হলো—
‘আমি নর্দমায় পড়া এক অসহায় নিরেট
যেন সুকান্তের ছুড়ে ফেলা এক পরিত্যক্ত সিগারেট।
আমি রাতজাগা কুকুর চিৎকার করে উঠি—সব আছে ঠিক
আমি পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ এক পরাজিত সৈনিক।
আমি পাগলের মতো গেয়ে চলি যেইসা মাক্ষি গিরে গ্যারাম তেলমে
উইসা র্যাহেনা প্যাড়েগা সেন্ট্রাল জেল মে।’