কিলিয়ান এমবাপ্পে ঠিক কী বলেছিলেন যে চীন এতটা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও চীনের ইন্টারনেটে এর উত্তর খোঁজা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ প্রশ্ন করছেন, কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন, আবার কেউ উত্তর দিতে গিয়ে এমন সব সাংকেতিক ভাষার আশ্রয় নিচ্ছেন, যেন ফুটবল নিয়ে নয়, বরং কোনো গোপন রাষ্ট্রীয় অভিযানের বিষয়ে কথা বলছেন!
ইতিমধ্যেই রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা ফরোয়ার্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে একাধিক চীনা ব্র্যান্ড। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপ লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা ও কাজের বিরুদ্ধে সমাজের সব মহল একজোট হবে। তবে এত কঠোর পদক্ষেপের পরও চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন—এমবাপ্পে আসলে কী বলেছিলেন?
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে এমবাপ্পের উপস্থিতির পর। সেদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম ভাইরাল হয়। এক সাক্ষাৎকারে নিজের সবচেয়ে মজার মিম সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এমবাপ্পে জানান, তাঁর ভালো লেগেছিল এমন একটি ভিডিও, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। কথাটি বলার সময় পর্দায় চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংয়ের অবয়ব ভেসে ওঠে।
চীনে মাও সে-তুংকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর শাসনামলে গৃহীত বিভিন্ন নীতির কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ফলে চীনে তাঁকে নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করা প্রায় নিষিদ্ধ।
এমবাপ্পের আলোচিত ভিডিওটি অবশ্য কয়েক মাস আগের। কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়তেই চীনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একে একে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং বন্ধ হয়ে যায় লা লিগার সম্প্রচার। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমবাপ্পে ও তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।
তবে চীনে অবস্থানরত অনেকেই এসব প্রতিক্রিয়ার কথা জানতে পারলেও ঠিক কোন মন্তব্যের কারণে এই ঝড় উঠেছে, তা বুঝতে পারছেন না। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে অনেকে জানতে চাইছেন, এমবাপ্পে আসলে কী বলেছেন?
চীনের ইন্টারনেট জগতে বাইরের বিশ্বের তথ্যের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ফলে এমবাপ্পেকে নিয়ে তুমুল আলোচনা চললেও সেই আলোচনার মূল সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা অনেকেরই অজানা।
আবার যাঁরা বিষয়টি জানেন, তাঁরাও সরাসরি উত্তর দিতে পারছেন না। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে সাংকেতিক ভাষার ব্যবহার। মাওয়ের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে কেউ তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ‘১০০ ইউয়ানের নোটে থাকা ব্যক্তি’ হিসেবে। কেউবা বলছেন, ‘শিক্ষক’—মাও নিজেও একসময় এই উপাধি ব্যবহার করতেন।
ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। মিমের কিছু অংশ ঝাপসা করে দেওয়া হচ্ছে; কোথাও ঢেকে দেওয়া হচ্ছে এমবাপ্পের মুখ, আবার কোথাও বাদ দেওয়া হচ্ছে ‘স্বৈরশাসক’ শব্দটি। মূল বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা থাকলেও তা পুরোপুরি দেখানো বা বলার উপায় নেই। পুরো ব্যাপারটি এমন যে, ঘটনাটি জানাতে চাওয়া হচ্ছে, কিন্তু বলার সময় চরম সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
অনেকে ঘটনার মূল কারণ জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন, তবে সেখানেও তেমন ফল মেলেনি। কারণ চীনে ব্যবহৃত এআই চ্যাটবটগুলোও দেশটির ইন্টারনেটের মতোই কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীরাই নন, এমবাপ্পের মন্তব্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও কেউ মাওয়ের নাম উল্লেখ করেননি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য কিংবা এমবাপ্পে, রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগার ক্ষমা প্রার্থনার কোনোটিতেই তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন—রাগ ষোলো আনা, কিন্তু কারণটি স্পষ্টভাবে বলার উপায় নেই।