চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংকে নিয়ে করা একটি মন্তব্যের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ফুটবল সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও বিতর্ক থামছে না। এর ফলে ইতিমধ্যে তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি হারিয়েছেন তিনি। এমনকি স্প্যানিশ ফুটবলের সম্প্রচারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফরাসি অধিনায়কের পাশে দাঁড়িয়েছেন ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফএফ) সভাপতি ফিলিপ দিয়ালো। তার দাবি, এমবাপ্পের মন্তব্যের বিপরীতে প্রতিক্রিয়াটি অত্যন্ত তীব্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু খেলোয়াড়টি ক্ষমা চেয়েছেন, তাই এখন এই বিতর্কের ইতি টানা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ফরাসি সংবাদমাধ্যম উয়েস্ট-ফ্রান্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে কথা বলেন দিয়ালো। তার মতে, চীনের কোনো নেতাকে অসম্মান করা কিংবা দেশটির সাধারণ মানুষকে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য এমবাপ্পের ছিল না।
দিয়ালো বলেন, ‘আমি এই বিতর্ক দেখেছি। আমার মনে হয়, প্রতিক্রিয়াটা কিছুটা অতিরিক্ত হয়ে গেছে। কিলিয়ান কোনোভাবেই চীনের একজন নেতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কিংবা চীনের জনগণকে অপমান বা আঘাত দিতে চেয়েছিল বলে আমি মনে করি না।’
পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় ফরাসি ফুটবলার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনির সঞ্চালিত অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এর একটি ভিডিও থেকে। সেখানে নিজের পছন্দের ইন্টারনেট মিম নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এমবাপ্পে এমন একটি ছবির কথা বলেন, যেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংয়ের শরীরে তার নিজের মুখ বসানো ছিল।
সংশ্লিষ্ট ভিডিওতে এমবাপ্পেকে বলতে শোনা যায়, ছবিতে থাকা ব্যক্তি সম্ভবত চীনের একজন স্বৈরশাসক। যদিও তিনি সরাসরি মাও সে-তুংয়ের নাম উচ্চারণ করেননি। মূলত ফুটবলে এমবাপ্পের প্রভাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত একটি রসিকতার প্রসঙ্গ টেনেই এই মন্তব্য করেছিলেন ফরাসি তারকা। পরবর্তীতে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ামাত্রই চীনে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশটির সাবেক নেতাকে নিয়ে এমন মন্তব্যকে চরম অসম্মানজনক হিসেবে গণ্য করেন অনেক চীনা সমর্থক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বয়কটের জোরালো দাবি উঠতে থাকে।
তীব্র সমালোচনার মুখে গত মঙ্গলবার প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এমবাপ্পে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি নিজের মন্তব্যকে অনুচিত বলে স্বীকার করেন। সেখানে তিনি জানান, কাউকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। পাশাপাশি ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড চীনের জনগণ ও দেশটির ইতিহাসের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেন।
ফরাসি ফুটবল প্রধান ফিলিপ দিয়ালো এমবাপ্পের এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকেই সামনে এনেছেন। তার মতে, নিজের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন ফরাসি অধিনায়ক। তাই একই বিষয় নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
দিয়ালো বলেন, ‘আমি আশা করি, এই বিতর্ক আর দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিলিয়ান খুব ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করেছে, কোন পরিস্থিতিতে সে কথাগুলো বলেছিল। সে ক্ষমাও চেয়েছে। আমার মনে হয়, এবার বিষয়টি এখানেই শেষ করা উচিত, যাতে সে নিজের মৌসুমটা সবচেয়ে ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারে।’
তবে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইলেও বাণিজ্যিক ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাননি এমবাপ্পে। চীনের দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ, সাংহাই মিল্কগ্রাউন্ড ফুড টেক এবং পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইস্ট্রক বেভারেজ তার সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছে।
এমবাপ্পের ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবলের সম্প্রচার ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে লা লিগার ম্যাচ দেখানো বন্ধ করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্প্রচারমাধ্যম মিগু আগামী রোববার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচটি সম্প্রচার করবে না বলে জানিয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এমবাপ্পের পাশাপাশি ক্ষমা চেয়েছে তার ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং স্প্যানিশ লা লিগা কর্তৃপক্ষ। রিয়াল মাদ্রিদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমবাপ্পের মন্তব্যে চীনা জনগণ আহত হয়ে থাকলে ক্লাবটি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। একই সঙ্গে চীনের জনগণ ও তাদের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে এই স্প্যানিশ জায়ান্ট।
বিতর্কের প্রভাব কমাতে কূটনৈতিক পদক্ষেপও নিয়েছে লা লিগা কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির সভাপতি হাভিয়ের তেবাস বুধবার স্পেনে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি বিশেষ দল গঠন করেছেন।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানিয়েছেন, এমবাপ্পের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দেশটির সরকার। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিতর্কের অবসান হয়েছে কিংবা বাণিজ্যিক ও সম্প্রচারসংক্রান্ত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।