একটি স্যান্ডউইচের গোল রুটি, একজন দোকানদারের সঙ্গে আইনি লড়াই, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বিদ্রূপাত্মক তকমা—‘ডিক্টেটর’ বা স্বৈরশাসক। ২০২৪ সালে ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কেন্দ্র করে এমনই এক অদ্ভুত ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল নানা মিমের জোয়ার। সেই সব মিমে কখনো তাঁকে সামরিক পোশাকে, আবার কখনো ইতিহাসের কুখ্যাত শাসকদের অবয়বে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু মজার ছলে তৈরি সেই চরিত্রের সঙ্গে একদিন জড়িয়ে যাবে চীনের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সে–তুংয়ের নাম, বন্ধ হয়ে যাবে চীনে স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার সম্প্রচার, আর পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষমা চাইতে হবে এমবাপ্পে ও তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদকে—এমন চরম পরিণতির কথা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। একটি ভাইরাল মিম কীভাবে ফুটবল মাঠের ঠাট্টা পেরিয়ে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিল, সেই গল্পের সূত্রপাত হয়েছিল চীনে নয়, বরং ফ্রান্সে।
ঘটনাটি ২০২৪ সালের মার্চের। মার্শেইয়ের ইনফ্লুয়েন্সার ও খাবারের দোকানের মালিক মোহাম্মদ হেন্নি নিজের দোকানের একটি স্যান্ডউইচের বর্ণনায় এমবাপ্পের নাম ব্যবহার করেছিলেন। স্যান্ডউইচটির গোলাকার রুটির সঙ্গে তিনি তুলনা করেছিলেন ফরাসি তারকার মাথার আকৃতির। পণ্যের বর্ণনাটি ছিল, ‘বেকারির গোল রুটি, এমবাপ্পের মাথার মতোই গোল।’
সামান্য এই রসিকতাতেই তীব্র আপত্তি জানায় এমবাপ্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কেএমএ। তাঁর আইনজীবীর পাঠানো চিঠিতে আট দিনের মধ্যে স্যান্ডউইচের বর্ণনা থেকে এমবাপ্পের নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয় এবং অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। হেন্নি এই পুরো ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এমবাপ্পের এমন পদক্ষেপে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে একজন ফুটবল তারকার আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
হেন্নির এই প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সামনে আসে সেই শব্দ, যা পরবর্তীতে এমবাপ্পের পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়—‘ডিক্টেটর’। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেন্নি অভিযোগ করেছিলেন যে, স্যান্ডউইচ নিয়ে এই বিরোধের মাধ্যমে এমবাপ্পে নিজের নামের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্যে এমবাপ্পের নামের সঙ্গে ‘স্বৈরাচার’ ধারণাটি যুক্ত হয় এবং পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মিম ছড়িয়ে পড়ে।
তবে কেবল একটি স্যান্ডউইচের ঘটনা দিয়ে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিমের জনপ্রিয়তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে ছিল ফুটবল বিশ্বে তাঁর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা। ২০২২ সালে ফরাসি ক্লাব পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তির পর এমবাপ্পের ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ক্লাবের খেলোয়াড় কেনাবেচা, কোচ নিয়োগ কিংবা দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁর মতামত অধিক গুরুত্ব পায় বলে সে সময় আলোচনা চলছিল। সমর্থকেরা এমবাপ্পের এই প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করে তাঁকে এমন একজন হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন, যিনি ক্লাবের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মিমগুলোর উদ্দেশ্য মূলত ফুটবলে এমবাপ্পের কথিত প্রভাব নিয়ে ব্যঙ্গ করা; রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি সমর্থন প্রকাশ নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ডিক্টেটর তকমাটি তাঁর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁকে বড় বিপদে ফেলে দেয়। সেই ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রের নাম হয়ে যায় ডিক্টেটর এমবাপ্পে। কখনো তাঁকে সামরিক পোশাকে, কখনো সিংহাসনে বসা শাসকের বেশে দেখানো হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি ও ভিডিও এই প্রবণতাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। পিএসজি থেকে ২০২৪ সালে তাঁর চলে আসা এবং পরে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পরও মিমটি তাঁর নামে ব্যবহৃত হয়েছে।
মিমের জগতে শুধু একজন কাল্পনিক স্বৈরশাসক হয়েই থাকেননি এমবাপ্পে। তাঁর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বাস্তবের বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী নেতার মুখ ও পরিচয়। সাবেক জায়ারের শাসক মোবুতু সেসে সেকোর নাম থেকে ফ্রান্সের সতীর্থ উসমান দেম্বেলে তাঁকে ‘মোবুতু’ বলেও ঠাট্টা করেছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মিমগুলোর উদ্দেশ্য মূলত ফুটবলে এমবাপ্পের কথিত প্রভাব নিয়ে ব্যঙ্গ করা; রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি সমর্থন প্রকাশ নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ডিক্টেটর তকমাটি তাঁর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁকে বড় বিপদে ফেলে দেয়।
ডিক্টেটর এমবাপ্পে মিম নিয়ে অবশ্য আগে থেকেই অস্বস্তি ছিল ফরাসি তারকার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ফরাসি সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এই মিমের মধ্যে হাস্যরসের দিক থাকলেও ইতিহাসের ভয়াবহ স্বৈরশাসকদের সঙ্গে তুলনাটা তাঁর ভালো লাগে না। এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘এর একটা দিক মজার। কেউ কেউ নিছক হাসি-ঠাট্টার জন্য এসব করে। কিন্তু আরেকটি দিক অতটা মজার নয়। কারণ, ইতিহাসে এ ধরনের মানুষেরা কী ক্ষতি করেছেন, তা আমরা জানি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাঁরা মানুষ হত্যা করেছেন, লাখো-কোটি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছেন, তাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। আমি তো জীবনে এমন কিছু করিনি।’
কিন্তু সেই অস্বস্তিকর মিম নিয়েই পুরোনো একটি মন্তব্য এমবাপ্পেকে এখন বিতর্কের কেন্দ্রে ঠেলে দিয়েছে। ঘটনাটি ফরাসি ফুটবল পডকাস্ট দ্য ব্রিজের একটি সাক্ষাৎকারের। সেখানে নিজের সবচেয়ে মজার মিম সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমবাপ্পে বলেন, এমন একটি ভিডিও তাঁর ভালো লেগেছিল, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। কথাটি বলার সময় পর্দায় দেখা যায়, চীনের সাবেক নেতা মাও সে–তুংয়ের অবয়ব।
এমবাপ্পে সরাসরি মাওয়ের নাম বলেননি, তবে ছবিটি যে তাঁকেই নির্দেশ করছিল তা স্পষ্ট। ভিডিওটি কয়েক মাস আগের হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অক্টোবরের চলতি সপ্তাহে। আর ছড়িয়ে পড়তেই চীনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মূল ভিডিওটি পরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিতর্কের গুরুত্ব বুঝতে হলে চীনে মাওয়ের অবস্থানটিও বুঝতে হবে। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন মাও। তাঁর শাসনামলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি অনেক ইতিহাসবিদের। একই সঙ্গে চীনের সরকারি ইতিহাসে তিনি দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছেন। ফলে মাওকে নিয়ে বিদ্রূপ চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
এমবাপ্পের কাছে যা ছিল নিজের একটি ভাইরাল মিম নিয়ে রসিকতা, চীনের অনেকের কাছে তা হয়ে উঠল দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে অসম্মান করার শামিল। বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথম ধাক্কাটা লাগে এমবাপ্পের বাণিজ্যিক স্বার্থে। চীনের তিন প্রতিষ্ঠান—পানীয় প্রস্তুতকারক দংপেং এবং দুগ্ধজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড—ফরাসি তারকার সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমবাপ্পেকে ঘিরে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশটির কয়েকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর অ্যাকাউন্টের কার্যক্রম সীমিত করা হয়। এরপর দেখা যায় চীনে লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন এমবাপ্পে। ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় দেওয়া বিবৃতিতে তিনি লেখেন, ‘আমার মন্তব্যটি বিবেচনাহীন ছিল। এখন বুঝতে পারছি, এতে চীনের অনেক মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথায় যাঁরা কষ্ট পেয়েছেন, তাঁদের সবার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। চীনের জনগণ ও তাদের ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।’
কিন্তু ততক্ষণে বিতর্কটি আর শুধু এমবাপ্পের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে রিয়াল মাদ্রিদ, লা লিগা এবং চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এমবাপ্পের দুঃখ প্রকাশের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগী হয় লা লিগা কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি।
এরপর বুধবার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চায় রিয়াল মাদ্রিদ। ক্লাবটি জানায়, এমবাপ্পের মন্তব্যে চীনের মানুষ যে অস্বস্তি ও কষ্ট পেয়েছেন, তার জন্য তারা দুঃখিত। রিয়ালের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কারণে চীনের জনগণের যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, এর জন্য রিয়াল মাদ্রিদ ক্ষমা প্রকাশ করছে।’
তবে ক্ষমা চাওয়ার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রিয়ালের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এমবাপ্পের মন্তব্যকে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তাদের মতে, খেলোয়াড়ের মন্তব্যের দায় ক্লাবও এড়াতে পারে না। সিএমজির বক্তব্য, ‘রিয়াল মাদ্রিদ যথাযথভাবে ক্ষমা প্রার্থনা না করা পর্যন্ত এ নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।’
বিতর্কের প্রভাব এমবাপ্পের ব্যক্তিগত স্পনসরশিপেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। চীন আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় বাজার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক সমর্থক রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের, আর লা লিগার জন্যও চীনের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। লা লিগার একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, কেবল চীন ও যুক্তরাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক সম্প্রচার স্বত্বের ‘সিংহভাগ’ অর্থায়ন করে থাকে, যার আর্থিক মূল্য ২০২৪-২৫ মৌসুমের জন্য ৭৪.৮ কোটি ইউরো (৮৩.৪ কোটি ডলার)।
রিয়াল মাদ্রিদপন্থী সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদের ক্লাবটি তাদের জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশই চীন থেকে আয় করে। এ ছাড়া হাইসেন্স, স্পোর্টস বেটিং প্রতিষ্ঠান কাইয়ুন স্পোর্টস এবং লিংলং টায়ারের মতো প্রধান চীনা কোম্পানিগুলো রিয়াল মাদ্রিদের শীর্ষস্থানীয় স্পনসরদের তালিকায় রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সেসব চুক্তি ও আয়েও বড় ধাক্কা লাগে কি না।