ফুটবল মাঠের জাদুকরী নৈপুণ্যে চীনের লাখ লাখ মানুষের প্রিয়পাত্র কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেখানে ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা তাকে দিয়েছেন এক বিশেষ ডাকনাম— ‘গুইগুই’। জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র ‘টিনএজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস’ থেকে অনুপ্রাণিত একটি মিমের সূত্র ধরে তার এই নাম রাখা হয়েছিল, যার বাংলা অর্থ ‘কচ্ছপ’। তবে সেই জনপ্রিয়তাই এখন বিতর্কের মুখে, কারণ এমবাপ্পে এখন চীনের তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সম্প্রতি ইন্টারনেটে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ফরাসি এই তারকাকে চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংকে নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে রসিকতা করতে দেখা গেছে। এই ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছে চীনা নাগরিকরা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, দেশটির দুটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের যাবতীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।

চীনের পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডংপেং এবং দেশটির বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ আজ এমবাপ্পের সঙ্গে সম্পর্ক বাতিলের কথা জানিয়েছে।

ডংপেং তাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন যেকোনো আচরণের কঠোর বিরোধিতা করে আমাদের প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি হলো শূন্য সহনশীলতা।’ প্রতিষ্ঠানটি আরও স্পষ্ট করে বলেছে যে, অবিলম্বে এমবাপ্পের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের বিশ্বকাপের সময় ২৭ বছর বয়সী এই ফ্রান্স অধিনায়কের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যেত ডংপেংয়ের বিজ্ঞাপনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি সেই বিজ্ঞাপনে এমবাপ্পেকে ডংপেংয়ের স্পোর্টস ড্রিংক পান করতে দেখা যেত।

একই কঠোর অবস্থান নিয়েছে মেংনিউও। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অবিলম্বে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করছে আমাদের প্রতিষ্ঠান।’ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন যেকোনো কথা বা কাজের কঠোর বিরোধিতা করে মেংনিউ। এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি হলো শূন্য সহনশীলতা।’

ঠিক কী বলেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে সর্বত্র। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে এমবাপ্পেকে বলতে শোনা যায়, ইন্টারনেটে দেখা সবচেয়ে মজার মিমটি ছিল তাঁর মুখের ছবি অন্য একজনের মুখের ওপর বসিয়ে তৈরি করা। সেই ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে এমবাপ্পে বলেন, ‘কোনো এক লোকের মুখে, আমার মনে হয় তিনি একজন চীনা স্বৈরশাসক।’

ধারণা করা হচ্ছে, এমবাপ্পে চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংকে নিয়ে তৈরি একটি মিমের কথা উল্লেখ করেছেন। ইন্টারনেটে মাওয়ের ছবির ওপর এমবাপ্পের মুখ বসিয়ে তৈরি করা একটি মিম ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। তবে শুধু মাও নন, ইতিহাসের আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছবির সঙ্গে এমবাপ্পের মুখ বসিয়ে মিম তৈরি করা হয়েছে। যদিও বার্তা সংস্থা এএফপির ফ্যাক্ট চেক বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে এই ভিডিওটির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

চীনে মাও সে-তুংকে নিয়ে রসিকতা করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত এই নেতাকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করাকে চীনারা চরম অসম্মানজনক মনে করে এবং সামাজিকভাবেও এটি নিষিদ্ধের কাছাকাছি। স্বাভাবিকভাবেই এমবাপ্পের এই মন্তব্য চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটির জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ওয়েইবোতে ‘ডংপেং বেভারেজ এমবাপ্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে’ বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওয়েইবোর একজন ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত গুরুতর ভুল মন্তব্য...সব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ অনেকে দাবি জানিয়েছেন, ডংপেংয়ের এনার্জি ড্রিংকের বোতল থেকেও এমবাপ্পের ছবি সরিয়ে ফেলা হোক। অন্যদিকে, চীনের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন ফুটবল সংবাদমাধ্যম ডংচিউদি সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমবাপ্পের মন্তব্য ‘চীন ও চীনা জনগণের প্রতি অপমানজনক’ এবং এর ফলে ‘চীনা ফুটবলপ্রেমী ও চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে’।