একটি সাধারণ মিম নিয়ে করা মন্তব্য এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এর ফলে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, রিয়াল মাদ্রিদ এবং এমনকি স্পেনের লা লিগাও। এমবাপ্পের একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম স্পেনে লা লিগার সব ধরনের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও এমবাপ্পে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং রিয়াল মাদ্রিদও দুঃখ প্রকাশ করেছে, তবে চীনের কঠোর মনোভাবের কারণে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বরং রিয়াল মাদ্রিদের দেওয়া ব্যাখ্যায় তারা মোটেও সন্তুষ্ট নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বেইজিং।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) স্পোর্টস অ্যান্ড ইয়ুথ সেন্টারের একজন মুখপাত্র রিয়াল মাদ্রিদের দেওয়া বিবৃতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমবাপ্পের বিতর্কিত মন্তব্যটিকে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা রিয়াল মাদ্রিদ করেছে, তা মেনে নিতে নারাজ চীন। চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই নির্দিষ্ট মন্তব্যটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছে।
চীনা সম্প্রচারমাধ্যমটি তাদের বক্তব্যে জানিয়েছে, ‘এমবাপ্পে কখনো কাউকে অপমান করতে চাননি’ এবং তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে—রিয়াল মাদ্রিদের এমন ব্যাখ্যা তারা গ্রহণ করছে না। তারা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এমবাপ্পের এই মন্তব্যের দায়ভার থেকে রিয়াল মাদ্রিদের মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সিএমজির মুখপাত্র আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদ যথাযথভাবে দুঃখ প্রকাশ না করা পর্যন্ত এ নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।’
পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয় এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। সেখানে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডকে তাঁর সবচেয়ে পছন্দের মিম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এমন একটি মিমের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ ছবিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ছবিতে চীনের সাবেক নেতা মাও সে–তুংয়ের অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছিল।
এমবাপ্পে সরাসরি মাওয়ের নাম উল্লেখ না করলেও, তাঁর এই মন্তব্য চীনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর ফলে দেশটির তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান—দংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড—ফরাসি তারকার সঙ্গে তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে দেয়। পাশাপাশি চীনে লা লিগার সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে এমবাপ্পে ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় পৃথক বিবৃতি দিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। চীনের জনগণ এবং তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রতি তাঁর ‘গভীর শ্রদ্ধা’ রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে তাঁর এই প্রচেষ্টাতেও বিতর্ক থামেনি। এরপর বিষয়টি মীমাংসার জন্য মাঠে নামে লা লিগা কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির সভাপতি হাভিয়ের তেবাস মঙ্গলবার সিএমজিকে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি এমবাপ্পের আচরণকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন এবং চীনের মানুষ যে মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছেন, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে চীন কেবল লা লিগা বা এমবাপ্পের ব্যক্তিগত দুঃখ প্রকাশে সন্তুষ্ট হয়নি। তারা রিয়াল মাদ্রিদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত ক্ষমাপত্র দেওয়ার দাবি জানায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রিয়াল মাদ্রিদ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। ক্লাবটি চীনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের প্রতি তাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার কথা জানায় এবং এমবাপ্পের আগের দুঃখ প্রকাশের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেয়।
রিয়াল মাদ্রিদের এই বিবৃতির পর চীনের সম্প্রচারমাধ্যমটি নিশ্চিত করেছে যে, লা লিগার মাধ্যমে তারা ক্লাবটির লিখিত ক্ষমাপত্রটি পেয়েছে। তবে এই পত্রটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না, কিংবা বন্ধ থাকা সম্প্রচার পুনরায় চালু করা হবে কি না—সে বিষয়ে তারা কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
বরং চীনের পক্ষ থেকে আরও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। সিএমজির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন যেকোনো কথা বা কাজ চীনের সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়বে। এর বিপরীত কিছু ভাবার দিবাস্বপ্ন দেখা রিয়াল মাদ্রিদের বন্ধ করা উচিত।’