কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চীন ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন এখনো শেষ হয়নি। ফরাসি তারকার এই মন্তব্যের কারণে চীনের জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এই ক্ষমাপত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সংকট কাটেনি। চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) এখনো লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার পুনরায় চালুর কোনো ঘোষণা দেয়নি। ফলে এমবাপ্পের এই মন্তব্য এখন স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য এক বড় বাণিজ্যিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) চায়না মিডিয়া গ্রুপ নিশ্চিত করেছে যে তারা রিয়াল মাদ্রিদের আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপত্রটি পেয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি পরিচালনাকারী এই সংস্থাটি জানিয়েছে, লা লিগা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রিয়ালের পাঠানো চিঠিটি তাদের কাছে পৌঁছেছে। তবে এই ক্ষমা প্রার্থনাকে তারা যথেষ্ট মনে করছে কি না কিংবা কবে থেকে স্প্যানিশ লিগের ম্যাচগুলো আবার সম্প্রচার করা হবে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা জানায়নি।
পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় ফরাসি অনুষ্ঠান 'দ্য ব্রিজ'-এ এমবাপ্পের একটি মন্তব্য থেকে। ওই অনুষ্ঠানে নিজের পছন্দের ইন্টারনেট মিম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ফরাসি ফরোয়ার্ড এমন একটি ছবির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন 'চীনা স্বৈরশাসকের' ছবিতে। যদিও তিনি সরাসরি কারও নাম বলেননি, তবে ওই মিমটিতে চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই চীনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এমবাপ্পে। দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে তাঁকে বয়কটের জোরালো দাবি ওঠে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে দেয় চায়না মিডিয়া গ্রুপ। একই সঙ্গে এমবাপ্পেকে নিয়ে প্রচারিত অনুষ্ঠান এবং তাঁর বিজ্ঞাপন প্রচারেও বিধিনিষেধ আরোপ করে ওই সংস্থাটি।
বিতর্কের মুখে পড়ে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এমবাপ্পে। ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি নিজের মন্তব্যকে অবিবেচনাপ্রসূত বলে স্বীকার করেন। ফরাসি অধিনায়ক দুঃখ প্রকাশ করে জানান, তাঁর কথায় চীনের জনগণ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন।
এমবাপ্পে বলেন, “আমার মন্তব্যটি অবিবেচনাপ্রসূত ছিল। এখন বুঝতে পারছি, এতে চীন এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ কষ্ট পেয়েছেন। আমার কথায় যাঁরা আঘাত পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে ক্ষমা চাইছি।”
তবে কেবল এমবাপ্পের ব্যক্তিগত ক্ষমা প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়নি চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। তারা রিয়াল মাদ্রিদের কাছ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব স্বীকার এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। বুধবার সকালে চীনা সংবাদমাধ্যমে রিয়ালের নামে প্রচারিত কিছু ব্যাখ্যা সিএমজি প্রত্যাখ্যান করে। সেখানে দাবি করা হয়েছিল যে, এমবাপ্পে কাউকে অপমান করতে চাননি এবং এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। তবে সম্প্রচারমাধ্যমটির স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, একজন খেলোয়াড়ের মন্তব্যের দায় থেকে তার ক্লাব পুরোপুরি সরে দাঁড়াতে পারে না।
সিএমজির ক্রীড়া ও যুব বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, রিয়ালের প্রাথমিক অবস্থান তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দাবি করেন, এমবাপ্পের মন্তব্য চীনের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে সন্তোষজনক ক্ষমা না পাওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে আর কোনো আলোচনা না করার কথা জানান তিনি।
এই পরিস্থিতির পর বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় রিয়াল মাদ্রিদ। এক বিবৃতিতে ক্লাবটি জানায়, এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে চীনের জনগণের মনে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার জন্য তারা দুঃখিত। রিয়াল আরও উল্লেখ করে যে, চীন, দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। পাশাপাশি চীনের লাখ লাখ রিয়াল সমর্থকের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে ক্লাবটি।
এমবাপ্পের প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রিয়াল জানায়, বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মূল্যবোধে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্প্যানিশ ক্লাবটি চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ইচ্ছাও প্রকাশ করে।
এরপর বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায় রিয়ালের চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে চায়না মিডিয়া গ্রুপ। তবে সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা কোনো ঘোষণা দেয়নি।
এদিকে এই বিতর্কের প্রভাব পড়েছে এমবাপ্পের ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক চুক্তির ওপরও। চীনা পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডংপেং বেভারেজ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান মেংনিউ ও সাংহাই মিল্কগ্রাউন্ড ফুড টেক ফরাসি তারকার সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এছাড়া চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবো ও শিয়াওহংশুতে তাঁর অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে মাঠের বাইরে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও ভাবমূর্তির সংকটের মুখে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড।
পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নিয়েছে লা লিগা কর্তৃপক্ষও। সংস্থাটির সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি স্পেনে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও ক্রীড়া সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই লক্ষ্যেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এক বিবৃতিতে লা লিগা জানিয়েছে, এমবাপ্পের মন্তব্যে চীনা সমর্থকদের মনে যে আঘাত লেগেছে, সে জন্য তারা দুঃখিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ক্লাব ও খেলোয়াড়দের জন্য সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও যোগাযোগসংক্রান্ত নির্দেশনা তৈরির কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বুধবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থনাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। যদিও তাঁর বক্তব্যে লা লিগার সম্প্রচার পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
ফলে এমবাপ্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক এখন আর শুধু ফরাসি তারকা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে স্প্যানিশ ফুটবলের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন অনিশ্চয়তার মুখে। রিয়ালের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার পরও সেই সংকট আপাতত কাটেনি।