ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোটার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দুটি অদ্ভুত ও বিপরীতমুখী বিষয় সামনে চলে আসে। প্রথমত, নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আরব ইসরায়েলিদের অভাবনীয় সাফল্য চোখে পড়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় যাঁদের কণ্ঠস্বর এবং উদ্বেগ প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল, তাঁরাই এখন সরকার গঠনের মূল চালিকা শক্তি বা ‘কিংমেকার’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের মূল ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো আরবদের ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল।
নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটের নেতারা পুরো নির্বাচনী প্রচারণার সময় বারবার দাবি করেছেন যে, তাঁরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট করবেন না। যদিও আরব দলগুলোর নেতৃত্ব এই জোটকে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে নাফতালি বেনেট শুরু থেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ না করার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অনমনীয় অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোনো দল কার্যকর কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নির্ধারণ করবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বুথফেরত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি আসন পাচ্ছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনি নিশ্চিতভাবেই বিরোধী শিবিরের কোনো একটি দলকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করবেন। এই বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকট।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইসরায়েলে যেন দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরকার গঠিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের দল। গুঞ্জন রয়েছে যে, বেনেটকে নিজের দিকে টানতে ইতিমধ্যেই হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন তিনি। জানা গেছে, বেনেটের দল ‘টুগেদার’ এবার ১২-১৩টি আসন পেতে পারে। যদি তা ঘটে, তবে নেতানিয়াহুর জোটের মোট আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬২ বা ৬৩টি, যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট।
তবে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। নাফতালি বেনেটের দল নেতানিয়াহুর জোটের অংশ নয়; বরং তারা কট্টর নেতানিয়াহুবিরোধী এবং বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান অংশীদার। বেনেট ও ইয়ার লাপিদ মূলত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যেই এই জোট গঠন করেছিলেন।
সরকার গঠনের এই রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দর-কষাকষি চলতে যত সময়ই লাগুক—তা কয়েক সপ্তাহ হোক বা কয়েক মাস—তত দিন নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। আর যদি কোনো সরকার গঠন করা সম্ভব না হয়, তবে নতুন নির্বাচন ঘোষণা হওয়া পর্যন্ত তিনিই দায়িত্বে থাকবেন। এমনকি বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর বেনেট এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন যে “নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরে গেছেন এবং তাঁর সরকারের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে।”
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতারা পুরো নির্বাচনী প্রচারে বারবার বলেছেন যে তাঁরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো জোট করবেন না। যদিও আরব দলগুলোর নেতৃত্ব এ জোটকে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে নাফতালি বেনেট শুরু থেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ না করার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অনমনীয় ছিলেন।
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের আরেক শীর্ষ নেতা অ্যাভিগদর লিবারম্যানও যেকোনো ধরনের সংখ্যালঘু সরকারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইসরায়েলিদের পুনরায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়াই শ্রেয়। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে নেতানিয়াহুর নিজের দলের কিছু প্রবীণ রাজনীতিকও তাঁর জোট শরিকদের প্রতি ভিন্ন আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা নেতানিয়াহুকে ছেড়ে গাদি আইজেনকটের জোটে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
পুনরায় উল্লেখ্য যে, সরকার গঠনের এসব রাজনৈতিক সমীকরণ ও দর-কষাকষি চলতে যত সময়ই লাগুক—কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস, তত দিন নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। আর কোনো সরকার গঠন করা সম্ভব না হলে নতুন নির্বাচন ঘোষণা হওয়া পর্যন্ত তিনিই দায়িত্বে থাকছেন।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গত এক সপ্তাহে ইসরায়েলের ভেতরে একটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু হয়তো ইরান বা প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ বাঁধাতে পারেন কিংবা চলতি সংঘাত আরও উসকে দিতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের এই উত্তেজনা জোট গঠনের আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে। অথবা যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে একটি ‘যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠনের দাবিকে জোরালো করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এ ধরনের একটি ধারণার আভাস দিয়ে রেখেছেন। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির একজন কর্মকর্তা ওই সংবাদপত্রকে বলেছেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইসরায়েলে যেন দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরকার গঠিত হয়।”
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সেই সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক জটিলতা নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোকে পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে।