ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে বা এক্সিট পোলে গভীর রাতে এক নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরপরই প্রাথমিক আভাস পাওয়া গিয়েছিল যে বিরোধী জোট এগিয়ে রয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলেছে এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে জানানো হয়েছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান এবং ইয়াশার দলের নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৯টি আসন। এছাড়া আরব লিস্ট ১৯টি আসনে জয়ী হয়েছে।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট বা নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংখ্যা হলো ৬১ আসন। বর্তমান জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এই প্রয়োজনীয় সংখ্যা অর্জন করতে পারেনি। আরব দলগুলো যেহেতু নেতানিয়াহুর ঘোর বিরোধী, তাই লিকুদ পার্টির আসন সংখ্যা বাড়লেও নেতানিয়াহুর পক্ষে ৬১ আসনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো বর্তমানে অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। ঠিক একইভাবে, আরব দলগুলোর সরাসরি সমর্থন বা অংশগ্রহণ ছাড়া গাদি আইজেনকোটের পক্ষেও একটি স্থিতিশীল জোট গঠন করা সহজ হবে না।
তবে ভিন্ন তথ্যের কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রধান সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান ইলেভেন এবং চ্যানেল থার্টিন। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবির এবং আইজেনকোটের বিরোধী শিবির—উভয় পক্ষই ৫১টি করে আসনে জয়ী হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি আগের অনুমানের চেয়ে বেশি আসন জিতে এককভাবে সর্বোচ্চ ২৭টি আসন পেতে যাচ্ছে। বিপরীতে আইজেনকোটের দল ‘ইয়াশার’ ২১টি আসন লাভ করেছে। এর ফলে একক দল হিসেবে পার্লামেন্টে লিকুদ পার্টির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা নিশ্চিত হয়েছে।
কান ইলেভেনের দেওয়া তথ্যে আরও দেখা গেছে, লিকুদ পার্টি দুটি আসন বাড়িয়ে ২৭টিতে পৌঁছালেও তাদের মিত্র উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিত একটি আসন হারিয়ে ৬টিতে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের বামপন্থী ডেমোক্র্যাট দল একটি আসন হারিয়ে ৯টিতে নেমে এসেছে।
জরিপের এই নতুন ফলাফলের পর জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির প্রধান কার্যালয়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা গেছে। দলীয় কার্যালয়ে শীর্ষ নেতাদের আগমনে কর্মীরা গান গেয়ে এবং ব্যালট পেপার শূন্যে উড়িয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আমিচাই চিকলি কার্যালয়ে প্রবেশ করে নেতাকর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় ও করমর্দন করেন।
ফলাফল ঘোষণার পর নিজের দলীয় কার্যালয়ে সমর্থকদের সামনে বক্তব্য প্রদান করেন বিরোধী জোটের নেতা ও ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট। তিনি জনগণকে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এটা স্পষ্ট যে দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এবং নেতানিয়াহুর ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে।”
আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জনগণের এই অনাস্থি মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, সবাইকে নিয়ে একটি দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সরকার গঠন করতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তাঁর প্রস্তাবিত সরকার সবার জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করবে এবং হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ করবে। একই সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং শুধুমাত্র রাষ্ট্র ও নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মিথ্যা ও ব্যর্থতার যুগ এবার শেষ হয়েছে।”
ধারণা করা হচ্ছে, দুই প্রধান নেতা এখন নিজেদের বিজয়ী দাবি করে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট চাইবেন। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে দেশটিকে পুনরায় নতুন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।