ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে কথা না বলে বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকেই অধিক মনোযোগ দিতে চান।
গত সোমবার সাংবাদিক মার্ক হ্যালপেরিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স এই মন্তব্য করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মন্তব্যের ঠিক একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন।
সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমি তাঁর বিপক্ষেও সমর্থন দিচ্ছি না, পক্ষেও দিচ্ছি না। আমি ইসরায়েলি নির্বাচনে জড়াচ্ছি না।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, ‘আমি আমেরিকান প্রার্থীদের সমর্থন করি। আমার সব মনোযোগ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।’
উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ গত এপ্রিলে কোনো বিদেশি নেতাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন জেডি ভ্যান্স। সে সময় তিনি হাঙ্গেরির সাবেক ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে সমর্থন করেছিলেন, যিনি পরবর্তীতে পিটার ম্যাগিয়ারের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুই মেয়াদে উগ্র ইহুদিবাদী নেতা নেতানিয়াহু এবং তাঁর ডানপন্থী সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মার্কিন দূতাবাস পশ্চিম জেরুজালেমে সরিয়ে নেন এবং গোলান হাইটসে ইসরায়েলের কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এছাড়া তিনি ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তিতে নেতৃত্ব দেন। তাঁর এই পদক্ষেপগুলো মূলত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা চালানো সত্ত্বেও তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর চাপ ও বিধিনিষেধ আরও জোরদার করেছে।
তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত জেডি ভ্যান্স এখন ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের শর্তহীন সমর্থনের বিরুদ্ধে দলের ভেতরে গড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এই মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে, যা সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন যে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত রাখা উচিত, তবুও এই জোটের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ়—তা নিয়ে ট্রাম্পপন্থী বা ইহুদি রিপাবলিকানদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
গত জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার প্রতি ইসরায়েলের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে জেডি ভ্যান্স প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আপনারা কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না।’
ইসরায়েলবিরোধী দলগুলোর মূল নির্বাচনী ইস্যু এখন ইরান যুদ্ধ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভাকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না করার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে ইসরায়েলের অবশিষ্ট ‘একমাত্র শক্তিশালী মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই সমর্থন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে বাড়তি কোনো সুবিধা এনে দেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কিছু জনমত জরিপে দেখা গেছে, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং ইরানে সংঘাত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অনীহা নিয়ে অনেক ইহুদি অসন্তুষ্ট।
জরিপ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনী লড়াইয়ে লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘ইয়াশার পার্টি’। দলটির নেতা এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইসেনকোট জানিয়েছেন, সরকার গঠনের লক্ষ্যে তিনি একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন।