ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে এই নির্বাচনে কাউকে সমর্থন না দেওয়ার কথা বললেও, গত রোববার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং শান্তির জন্য আরও বড় অংশীদার’ বলে অভিহিত করেন। একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরানকে সামরিক ও আর্থিক—উভয় দিক থেকেই ‘পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না করলে খুব শীঘ্রই বাকি কাজ শেষ করা হবে।
ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েল যদি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কাউকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে, তবে ইরানকে দমানোর এই কাজ যুক্তরাষ্ট্রকে একাই শেষ করতে হবে। আর তিনি সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নন।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশটির সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫১টি আসন।
নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী হিসেবে বর্ণনা করে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েও তিনি টিকে আছেন এবং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। ট্রাম্পের মতে, নেতানিয়াহুর ওপর যে পরিমাণ চাপ ছিল, তা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হতো না। কিন্তু তিনি সেই চাপের মুখে দুর্বল না হয়ে বরং আরও দৃঢ় হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন অংশীদারত্বই প্রত্যাশা করে। ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছু করেছে। এই বার্তাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে আসন্ন পুনর্নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতি আমার পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করুন। নেতানিয়াহু কখনো আপনাদের হতাশ করবেন না!’
উল্লেখ্য, নেতানিয়াহু নিজের কারাদণ্ড এড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে পুনরায় হামলা শুরু করতে আগ্রহী বলে মনে করা হয়। চলতি মাসের শুরুতে টাইম সাময়িকী ট্রাম্পকে দুবার প্রশ্ন করেছিল যে, আরেক মেয়াদে নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উচিত কি না। জবাবে ট্রাম্প ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনে নিজের জনপ্রিয়তা এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়টি সামনে আনেন।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স ট্রাম্পকে প্রশ্ন করে, তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা (ইসরায়েল) চায় আমি যুক্ত হই। হ্যাঁ, তারা চায়।’ তবে নেতানিয়াহুকে তিনি বিশ্বাস করেন কি না, সে প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।’
যুক্তরাজ্যের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর ট্রাম্পের এই সমর্থন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাকিল আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই সমর্থন নেতানিয়াহুকে এই যুক্তি দেওয়ার সুযোগ করে দেবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনিই অপরিহার্য। তবে নির্বাচনে এই সমর্থনের প্রভাব অতিরঞ্জিত করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ভাকিল। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুকে নিয়ে ইসরায়েলের ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। ফলে তাঁর সমর্থকেরা আরও উজ্জীবিত হতে পারেন, তবে এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকটের সমাধান দিতে পারবে না।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রোস ক্রিগ ট্রাম্পের এই সমর্থনকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি ‘রাজনৈতিক উপহার’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনী প্রচারে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য এটি সহায়ক। তবে ক্রিগও মনে করেন, এটি নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হবে না।
ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নেতানিয়াহুর সমস্যাগুলো কাঠামোগত। এর মধ্যে রয়েছে ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি, ভোটারদের হতাশা এবং ৭ অক্টোবর হামলার পর নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টির এমন কিছু ভোটারকে দলটির পক্ষে আনতে পারে, যাঁরা নেতানিয়াহুকে ভোট দিতে দ্বিধায় আছেন। এতে দলটি এক বা দুটি আসন বেশি পেতে পারে। কিন্তু শুধু এই সমর্থনের কারণে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সমর্থনের মূলে রয়েছে ইরান যুদ্ধের ইস্যু। ধারণা করা হচ্ছে, নভেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে ইরানে পুনরায় হামলা শুরু করতে পারেন ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানজুড়ে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল, যা বর্তমানে কার্যত থেমে আছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই নৌপথ কার্যত বন্ধ করে দেয় এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। দুই পক্ষই নিজেদের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে এই নৌপথে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায়।
গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনী অধিক সংখ্যক তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে নেওয়ায় হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরেছিল। তবে চলতি মাসের শুরুতে ইরানের ধারাবাহিক কয়েকটি হামলার কারণে আবারও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে।
গত মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যাতে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্তের বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেই প্রস্তাব ব্যর্থ হয়। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।
রোববার ইরানের সংবাদমাধ্যমকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, প্রস্তাবটি এখনো কার্যকর আছে। ওয়াশিংটন শর্ত মেনে নিলে ছয় দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব এবং পরদিন আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। তবে রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু নিজের কারাদণ্ড এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে আবার হামলা শুরু করতে চান।
আরাগচি লেখেন, ‘শেষবার আপনারা কাজটি শেষ করতে চেয়েছিলেন। ইরান তখন আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আবার ভাগ্য পরীক্ষা করতে চান? স্বাগতম। তবে সাবধান; আমাদেরও কিছু অসমাপ্ত কাজ আছে।’
আরাগচি আরও লেখেন, ‘নেতানিয়াহু নিজে কারাগারে যাওয়া এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ইসরায়েলের জন্য এর পরিণতি কী হবে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জন্য কী হবে, তা নিয়ে তিনি ভাবছেন না।’
ক্রিগের মতে, নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলকে জোরদার করছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তিনি কূটনীতির চেয়ে যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ক্রিগ বলেন, ‘নৌ অবরোধ ইরানকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, সময় তাদের পক্ষে আছে। ট্রাম্পের হিসাব হলো, এ পর্যন্ত বড় ধরনের ছাড় দিতে না হলেও শেষ পর্যন্ত ইরান পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড় দিতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হবে।’
ক্রিগের মতে, ট্রাম্পের এই সমর্থন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিকে আরও জোরালো করেছে, যদিও কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে তেহরান মনে করতে পারে, সংঘাত বৃদ্ধি করলে আলোচনায় তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
ভাকিলের মতে, ট্রাম্পের এই সমর্থন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে, যা ভবিষ্যতে যৌথ সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখে। তবে ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখা কঠিন হতে পারে। তিনি আর বলতে পারবেন না যে, ইসরায়েলের চাপে বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
ভাকিল বলেন, ‘ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ অংশীদারত্ব এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছেন। তবে এ সমর্থনের অর্থ এটা নয় যে দুই নেতা নতুন কোনো সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রথমে কে সবচেয়ে বেশি চাপ দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হয়নি।’
ভাকিল আরও বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানের নেতাদের এই বিশ্বাস আরও জোরালো করবে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। আবার নেতানিয়াহু ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্পের অনীহা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের আগেই নতুন করে হামলা শুরুর পরিকল্পনা তৈরি করেছে পেন্টাগন। গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, দুই দেশের নির্বাচনের আগে ইরানে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আলোচনা করেছেন।
ক্রিগের মতে, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় শুরু হতে পারে ৩ নভেম্বরের পর, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাধা আর থাকবে না। দুই দেশের সামরিক বাহিনীই সেই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।’