যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী। এই সম্ভাব্য হামলায় ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার এবং জ্বালানি খাতের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে জানা গেছে। বর্তমানে দুই দেশই এই অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এই হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো ধরনের বহিঃশত্রুর হামলার তারা দাঁতভাঙা জবাব দেবে এবং সংঘাতকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান।

গত বুধবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তা এবং সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের সূত্র ধরে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি তীব্র ও কার্যকর হামলার পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিচালিত আগের বড় হামলাগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতে ঘাটতি দেখা দেয়।

কিছু মার্কিন পরিকল্পনাকারীর ধারণা, টানা তিন দিন ধরে ইরানে ব্যাপক পরিসরে তীব্র হামলা চালানো হতে পারে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো ইরানের অর্থনীতির এমন বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করা, যাতে তেহরান শেষ পর্যন্ত আলোচনায় নমনীয় হতে বা ছাড় দিতে বাধ্য হয়।

এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার পরিবর্তন করা। কিন্তু প্রায় আট মাসের সংঘাতের পরও ইরানের বর্তমান সরকার টিকে আছে। কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ-অবরোধের মুখেও দেশটিকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়নি। এই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই নতুন করে যৌথ হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর একাধিকবার বড় হামলার প্রস্তাব ডোনাল্ড ট্রাম্প আটকে দিয়েছেন। অক্টোবরের শুরুতে দুই দেশের বাহিনী হামলার প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও শেষ মুহূর্তে তিনি তা স্থগিত করেন। নভেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজারো মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ বাহিনীসহ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেরে গেলে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা তাঁর জন্য বেশ কঠিন হতে পারে, যা সামগ্রিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন করে যৌথ হামলার আশঙ্কাকে পুঁজি করে নেতানিয়াহু বিরোধীদের নিয়ে একটি ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেম বলেন, “তিনি (নেতানিয়াহু) বিষয়টি কাজে লাগিয়ে জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।” তবে এবার তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গভীর সন্দেহের মুখে পড়বেন বলে মনে করা হচ্ছে।

হামলার পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা। এর মধ্যে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত ‘পিক্যাক্স’ কেন্দ্রটিও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। জানা গেছে, ট্রাম্প সেখানে ২২ হাজার পাউন্ডের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছেন। তবে অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমির ওপর বিস্ফোরিত হওয়া এই বোমায় ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা কম।

জ্বালানি স্থাপনাগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্য তালিকায় রয়েছে। যদিও তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছু মার্কিন কর্মকর্তা শোধনাগারগুলোকে এড়িয়ে চলতে চান। ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলেও আঘাত করা হতে পারে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার কারণে গত বুধবার সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে না থাকা মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। তেহরানের বিশ্লেষক পেইমান সালেহি বলেন, “যুদ্ধ আমাদের বুঝিয়েছে, ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ানো। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। তবে পরমাণু বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। ইরানের দাবি, প্রাথমিকভাবে হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি চুক্তি হতে হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন শুরু থেকেই পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার প্রধান শর্ত হিসেবে রাখতে চায়।

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল বলেন, অঞ্চলটি যখন আরও অস্থিতিশীল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে পরিস্থিতির কী উন্নতি হবে, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, ইরানি আলোচক দলের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি তিন দিনে যুদ্ধ শেষ করার ধারণাকে আকাশকুসুম ‘কল্পনা’ বলে মনে করেন। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমাদের পাল্টা হামলা হবে আরও তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন ধাঁচের।”