আগামীকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবেন দেশটির নাগরিকরা। তবে এই নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন করতে কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। দেশটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই নির্বাচনকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর একটি গণভোট হিসেবেই এই নির্বাচনকে দেখছেন বহু ইসরায়েলি।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে এবারের লড়াই সহজ হবে না; তিনি, তাঁর দল এবং ক্ষমতাসীন জোট তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর দেশটিতে এটিই প্রথম নির্বাচন। সেই হামলায় প্রায় ১২ শ ইসরায়েলি নিহত হন এবং দুই শতাধিক মানুষকে জিম্মি করে হামাস। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় নির্বিচারে হামলা চালায় ইসরায়েল, যাতে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান এবং পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এই হামলা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের নির্বাচন পদ্ধতি বেশ স্বতন্ত্র। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রতিটি দল তাদের প্রার্থীদের একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে এবং ভোটাররা নির্দিষ্ট একটি দল বা তালিকা বেছে নেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দলের নেতা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। তাঁকে সরকার গঠন করতে হয়। দেশটির সংসদীয় পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, যেখানে ব্যাপক আলোচনা ও দর-কষাকষির প্রয়োজন হয়।
নির্বাচনের দিন ইসরায়েলে সরকারি ছুটি থাকে। স্কুল, সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন জনসেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় অধিকাংশ এলাকায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ১০টায় শেষ হবে। তবে হাসপাতাল, কারাগার এবং ছোট জনপদগুলোতে ভোটগ্রহণের সময় কিছুটা কম হতে পারে।
ভোটারদের জন্য তাদের নিবন্ধিত ঠিকানার নিকটবর্তী একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত থাকে এবং তাঁরা কেবল সেখানেই ভোট দিতে পারেন। তবে কারাবন্দি এবং সেনাসদস্যদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম নিয়ম রয়েছে। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট 'নেসেট'-এর নির্বাচন সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর হয়, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এর আগেও নির্বাচন হতে পারে। যেমন, পার্লামেন্ট ভেঙে যাওয়ায় ২০২২ সালে দেশটিতে নির্বাচন হয়েছিল, যা ছিল তিন বছরের মধ্যে পঞ্চম নির্বাচন।
ভোট দেওয়ার জন্য ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নিবন্ধিত সব ইসরায়েলি নাগরিক যোগ্য। পরিচয়পত্র হিসেবে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ইসরায়েলি পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে হয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের ভোটদানের হার এই নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। উল্লেখ্য, অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মতো ইসরায়েলে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে বিদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ নাগরিক ভোট দিতে পারেন না।
আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে সারা দেশে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হার বিবেচনা করা হয়। পার্লামেন্টে জায়গা পেতে হলে কোনো দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১০টি দল এই ন্যূনতম সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত হতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক দল কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তাই সরকার গঠনের জন্য দলগুলোকে জোট করতে হয়। দলীয় নেতারা সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতাকে নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করেন। ফলাফল ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সংসদীয় জোটগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আলঙ্কারিক।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নেসেটের একজন সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যিনি সাধারণত সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল বা জোটের নেতা হন। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রার্থী জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পান এবং নেসেটের আস্থা ভোটে সেই সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করা যায়। প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনিও ২৮ দিন সময় পান। দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন, যিনি ১৪ দিন সময় পাবেন। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে সরকার গঠনে ২০ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে এবং নির্বাচনের পর ৫০ দিনের কম সময়ে কোনো সরকার শপথ নেয়নি। সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া নেতা একটি নীতিগত কর্মসূচি প্রস্তাব করেন এবং নেসেটে বিপক্ষের চেয়ে বেশি ভোট পেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আইন অনুযায়ী সংখ্যালঘু সরকার গঠন করা সম্ভব, তবে অধিকাংশ সরকারই নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বা অন্তত ৬১ জনের সমর্থন পেয়েছে।
নির্বাচনের আগের সপ্তাহে বিভিন্ন জনমত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফলের আভাস পাওয়া গেছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান আসাফ শাপিরা বলেন, এটি ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য খুবই সমস্যার’।
অনেকের মতে, এই নির্বাচনটি মূলত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর একটি গণভোট। নেতানিয়াহু, তাঁর লিকুদ পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোট। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি বর্তমানে নেতানিয়াহুর জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছে।