ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য আজ এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার দিন। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে আজ মঙ্গলবার ভোট দিচ্ছেন ইসরায়েলি নাগরিকরা। ডানপন্থী এই নেতার রাজনৈতিক ভাগ্য এখন ভোটারদের হাতে। হয় তিনি ইরান এবং ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধ এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকবেন, অথবা ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে তাঁকে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে অতর্কিত হামলা চালায়। সেই ঘটনার পরপরই গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেন নেতানিয়াহু। এরপর তাঁর নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল। তবে এই দুই যুদ্ধ দেশে ও বিদেশে নেতানিয়াহুকে চরম সমালোচনার মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে কার্যত একঘরে করে দিয়েছে।
গাজা ও ইরানে সংঘাত শুরুর পর আজ ইসরায়েলে প্রথমবার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে নেতানিয়াহুর ওপর চাপের পরিমাণ এখন তুঙ্গে। দুই দশকের শাসন অভিজ্ঞতা এবং ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মাধ্যমে তিনি নিজের নেতৃত্বের ক্যারিশমা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি জোট সরকারের মাধ্যমে ইসরায়েলের দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও ছিল তাঁর।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াই সহজ হবে না। নির্বাচনের প্রাক্কালে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন এবং লড়াই হতে পারে হাড্ডাহাড্ডি। যদিও ইসরায়েলের বহুধাবিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অনেকে এখনও নেতানিয়াহুকে এগিয়ে রাখছেন, তবে এককভাবে বড় জয়ের সম্ভাবনা খুব কম।
নেতানিয়াহু লিকুদ পার্টির নেতা হিসেবে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শিবিরের জোটসঙ্গীদের নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হলেন কট্টর ডানপন্থী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। বর্তমানে বেন-গভির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী এবং স্মোত্রিচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার কারণে পশ্চিমা কিছু দেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বেন-গভির ও স্মোত্রিচের ওপর। তবে সাম্প্রতিক জরিপে ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টির প্রতি জনসমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে আছেন ইয়াশারের নেতা গাদি আইজেনকট। তাঁর সাথে রয়েছেন টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ আইজেনকটের প্রতি ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরেরই সমর্থন রয়েছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ভোট দেন না, বরং পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে এবং প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়। নেসেটে প্রবেশ করতে হলে কোনো দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়।
নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গাদি আইজেনকটকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। এছাড়া টুগেদারের নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দাবিদার। আজ স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে। এবার ইসরায়েলে ভোটার প্রায় ৭৩ লাখ এবং নেসেটের ১২০টি আসনে ভোট হচ্ছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৬১টি আসনে জয় প্রয়োজন।
নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারে প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন: প্রথমত, যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন। গত রোববার নেতানিয়াহু বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের হুমকিকে ‘চিরতরে মুখে ফেলার’ জন্য আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছেন। সেটা তখনই সম্ভব হবে, যদি তিনি (নেতানিয়াহু) ক্ষমতায় থাকেন।”
এর বিপরীতে গাদি আইজেনকট প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘ভীতি ছড়ানো, মিথ্যাচার ও হুমকিমূলক প্রচারের ওপর নির্ভর করার’ অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “ইসরায়েলে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো নেতার সঙ্গে ট্রাম্প পূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবেন—এটা তাঁর বিশ্বাস।”
নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—কারও জন্যই ক্ষমতার পথ সহজ নয়। আজকের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে আগামী বছর পুনরায় নির্বাচন হতে পারে। ততক্ষণ নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনা করতে হবে।
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েল এখন ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৭ অক্টোবরের হামলার অভিঘাত, গাজায় সামরিক অভিযান, ইরান যুদ্ধ এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থী নীতির কারণে সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অনেকে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ভার নির্ধারণের দাবি জানিয়ে লড়াই করছেন।
ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত মালি হাজাজ, যিনি গাদি আইজেনকটের কট্টর সমর্থক, তিনি বলেন, “একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।” অন্যদিকে, লিসা টরটর নামের এক ভোটার নেতানিয়াহুর বিদায় চেয়ে বলেন, “নতুন একটি সরকার আসবে। দেশের ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) যে ক্ষতি করেছেন, তা কিছুটা হলেও মেরামত করতে পারবে এ সরকার।” তবে লিকুদ পার্টির সমর্থক ১৮ বছর বয়সী নফ গাবে মনে করেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য নেতানিয়াহুই সঠিক ব্যক্তি এবং তিনি আরও বলেন, “নেতানিয়াহু সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো উপায়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।”
ফিলিস্তিন ইস্যুতে গাদি আইজেনকটও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী, যা কয়েক দশকের শান্তি আলোচনার মূল ভিত্তি। তবে তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস ঘটনার সমালোচনা করেছেন এবং নেতানিয়াহুর অতি ডানপন্থী শরিকদের অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন।
দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদী ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়ায় অনেক ভোটার নেতানিয়াহুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এখন আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও গাদি আইজেনকট মূল্যবোধের অমিলের কথা বলে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন, তবে বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুকে সরাতে পরিস্থিতি বুঝে আরব দলগুলো আইজেনকটের সম্ভাব্য সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে।
জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোতজ এসা-এল বলেন, “নির্বাচনে যে–ই জিতুক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে খুবই সামান্য। কারও এককভাবে বড় জয় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।”