বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চালানো হামলাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার ওপর চরম আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতপার্থক্যের দোহাই দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা চালানো অথবা নেতা-কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অধিকার কারও নেই।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে ক্বাফী রতন এসব কথা বলেন। সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় 'মুক্তি ভবনে' হামলার তীব্র প্রতিবাদ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা অভিযোগ করেন যে, গতকাল সোমবার রাত ১০টার দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল ব্যক্তি নিজেদের সরকারদলীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে মুক্তি ভবনের সামনে জড়ো হন। তাঁদের দাবি ছিল, সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন দলের সদস্যরা অবস্থান করছেন। এরপর তাঁরা প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে সিপিবির নেতা-কর্মীরা তাঁদের বাধা দেন, যার ফলে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। পুলিশ এসে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যালয়টি অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে দাবি করা হয়।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে সিপিবির অনেক নেতা-কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়েও মুক্তি ভবন ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই সেখানে হামলা চালানো একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী কাজ।

সমাবেশ থেকে এই হামলার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচার এবং সকল রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক সংগঠনের কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান নেতারা।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনের সভাপতিত্বে এবং বাসদের (মার্ক্সবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা জয়দেব ভট্টাচার্যের পরিচালনায় এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বজলুর রশীদ ফিরোজ, মুশতাক হোসেন, ইকবাল কবির জাহিদ, মোশরেফা মিশু, আব্দুল আলী, সৈয়দ হারুন অর রশীদ এবং মইনউদ্দিন চৌধুরী লিটন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল পল্টন মোড়, নূর হোসেন স্কয়ার ও বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

অন্যদিকে, সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করা এবং নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে পৃথক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে এবং ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন শুভর সঞ্চালনায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সভাপতির বক্তব্যে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে মানুষকে মবের শিকার করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান দেওয়ার কারণে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যুব ইউনিয়নের এই নেতা বলেন, কৃষি কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো এমন একটি কার্ড চালু করুন, যা দেখিয়ে মানুষকে প্রমাণ করতে হবে না যে তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে কথা বললে কিংবা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলে মানুষকে যেন আটক, হয়রানি ও মবের শিকার হতে না হয়। দেশের ১৮ কোটি মানুষ এই ভোগান্তি চায় না।

সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি মাহির শাহরিয়ার বলেন, গতকাল নেতা–কর্মীরা যখন কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন পুলিশ ভেতরে ঢুকে তল্লাশি চালায়। মব সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত না করে যাঁরা মবের শিকার হয়েছেন, পুলিশ তাঁদের ওপরই চড়াও হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের চরিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

এছাড়া সমাবেশে বক্তব্য রাখেন যুব ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন ভুঁইয়া এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ইনজামামুল। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল জাদুঘরের সামনে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।

উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক হন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল। তাঁর মুক্তির পর রাতে পুরানা পল্টনে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন সিপিবির নেতা-কর্মীরা। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে—এই অভিযোগ তুলে সিপিবির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে নানা স্লোগান দেন হামলাকারীরা।