সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার ঢাকার ধানমন্ডিতে এক মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনাবাজারের সামনে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন। তবে পুলিশের বাধায় সেই প্রতিবাদ কর্মসূচি সম্পন্ন করতে পারেননি তাঁরা। সেখান থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। এই পুরো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
দীপক শীলের মুক্তির পর গত সোমবার রাতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীরা একটি মিছিল বের করেন, যা পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়। এরপর যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার প্রতিবাদ জানান। দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং নানা স্লোগান দিতে থাকেন। যদিও পরে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং বড় কোনো সংঘাতে রূপ নেয়নি।
ঘটনার পর সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে বলেন, “লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল ব্যক্তি নিজেদের সরকারদলীয় কর্মী পরিচয় দিয়ে পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনের সামনে জড়ো হন। তাঁরা সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যরা অবস্থান করছেন দাবি করে প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সিপিবির নেতা-কর্মীরা বাধা দিলে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হন।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা কার্যালয়ে অবস্থানরত কথিত নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকেন।” সিপিবির নেতারা এই ঘটনাকে অবাধ রাজনৈতিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া সিপিবি অভিযোগ করেছে যে, সোমবার রাতে হামলার পর পুলিশ তাঁদের দলের দুই সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে আটক করে নিয়ে যায়, যদিও গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এভাবে একের পর এক রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, নেতাদের বাসভবন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ‘মব’ করার প্রবণতাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও পড়ে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদ কার্যালয় ঘিরে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন যুবদলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। অভিযোগ যে, পুলিশ বিএনপির কর্মীদের কিছু না করে উল্টো জাসদ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে কয়েক দফা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় মিছিল নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের শূন্যতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। তখন অনেকে একে তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর এখন রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও নেতাদের বাসায় হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকা রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধরন ভিন্ন হলেও একটি সাধারণ মিল দেখা যাচ্ছে—প্রায় প্রতিটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী সামনে থেকেছেন এবং পুলিশ ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে দাবি করে এবং সহনশীল রাজনীতির কথা বলে। এখন বিএনপি, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে তারা প্রকৃতপক্ষে কোন পথ বেছে নেবে। কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা বা কার্যালয়ে হুমকি দেওয়া হবে। কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আইন ভঙ্গ করেছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো দলের কর্মীদের নয়।
উল্লেখ্য, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সিপিবি ভোট বর্জন করেছিল এবং আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও তারা ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। তা সত্ত্বেও এখন সিপিবিকে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা এই পরিস্থিতি মেনে নেবেন নাকি নেতা-কর্মীদের নিবৃত্ত করবেন, তা দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলাকালে পুলিশ ২৮৯ জনকে আটক করে, যাদের মধ্যে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। জাসদের দাবি ছিল, পুলিশি অনুমতি নিয়েই সভার আয়োজন করা হয়েছিল এবং সভা চলাকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালান। পুলিশ এসে কার্যালয় ঘেরাও করে নেতা-কর্মীদের আটক করে এবং কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়। যদিও পরে জামিনে মুক্তি পান গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা এবং পুলিশ নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের জড়ো হওয়ার যে দাবি করেছিল, তা প্রমাণ করতে পারেনি। জাসদ আওয়ামী লীগের সহযোগী হলেও দেশের আইনে নিষিদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সবাইকে আটক করাকে বাড়াবাড়ি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতার ভাগ ভোগ করায় দলটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং জনসমর্থন হারিয়েছে। তবুও তাদের কার্যালয় ও নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং সম্প্রতি জি এম কাদেরের বাসায় হামলা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অরক্ষিত হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসাবাড়ি ও কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছিল। এর মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটিতেও হামলা হয়। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা বাড়িটিতে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন এবং পরে ক্রেন ও খননযন্ত্র দিয়ে বাড়িটির বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়। ১৭ নভেম্বর অবশিষ্ট অংশ ভাঙতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা দেয়। এই ঘটনাগুলোতে অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের প্ররোচনা থাকলেও তৎকালীন সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
রাজনৈতিক মতভিন্নতা বা অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনের আওতায় বিচার হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কোনো দলের কার্যালয়ে হামলা বা নেতা-কর্মীদের হেনস্তা করা হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা সব বৈধ রাজনৈতিক দলের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি এখন সরকারে, তাই তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যবস্থা নেওয়া এবং পুলিশের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। সিপিবি, জাসদ ও জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের অধিকার কতটা সুরক্ষিত তার একটি পরীক্ষা।