মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পর কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর উত্তরের তিনটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সংগঠনের ১৪ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। একই সময়ে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার এই সিদ্ধান্ত দলের অন্যান্য সদস্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আশা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যারা দখল, হামলা বা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, তারা এই পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নেবেন। তবে এই কঠোরতার ধারাবাহিকতা কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ রাড্ডার এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; এর আগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নাম সামনে এসেছে। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার প্রক্রিয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
অতীতের একটি ঘটনার কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ছাত্রদলের কিছু সদস্য বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও টেন্ডারবাজির ব্যাপক সমালোচনার মুখে ১৯ নভেম্বর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম স্থগিত করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ২৬ ডিসেম্বর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যারা সন্ত্রাস, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করছে বা করবে, তাদের জন্য পিন্টুর গ্রেপ্তার একটা মেসেজ।’ তবে পিন্টু ২৯ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান এবং ২০০৫ সালে সরকার সেই মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। কঠোর অবস্থানের পর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব এই উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয়।
বর্তমানে বিএনপির সামনে বড় পরীক্ষা। বহিষ্কৃত নেতারা আগের মতো প্রভাব ধরে রাখতে পারবেন কি না, নতুন কমিটিতে বিতর্কিতদের আশ্রয়দাতারা জায়গা পাবেন কি না এবং অন্যান্য এলাকার একই ধরনের অভিযোগে সমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—তা দেখার বিষয়। দলীয় শাস্তির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার। বিশেষ করে রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত স্বাভাবিক করা এখন সময়ের দাবি। অপরাধ দমনে প্রতিবার দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার অপেক্ষা করতে হলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
দেশের সাধারণ মানুষ কেবল বহিষ্কারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করবে না, বরং নিজেদের বাড়ি, ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমেই এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা পরিমাপ করবে। মিরপুরের এই সিদ্ধান্তের সুফল যখন অন্য এলাকার মানুষও পাবেন, তখনই কেবল জনগণের আস্থা ফিরবে।