ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কার ও মেরামতের কাজ যে এগিয়ে চলছে, সেই খবরটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। সাম্প্রতিক সময়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া একটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় সচল করার জন্য এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল ভবনের দেয়াল মেরামত করা, নতুন করে দরজা-জানালা বসানো কিংবা রঙের কাজ শেষ করার মাধ্যমেই স্বাস্থ্যসেবা পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, আধুনিক সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের যথাযথ ব্যবস্থা না করা হলে, সংস্কার করা ভবনেও আগের মতো মানসম্মত সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে না। তাই বর্তমান সময়ে এই ঘাটতিগুলো পূরণ করার দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগে দৈনিক গড়ে ৪০০ জন মানুষ সেবা গ্রহণ করতেন, যাঁদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন নারী ও গর্ভবতী মা। এছাড়া প্রায় ১০০ শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু গত শনিবার সেখানে সেবা পেয়েছেন মাত্র ৫৬ জন, যাঁদের মধ্যে শিশু ৩৫ জন এবং নারী ২১ জন। সেবার এই বিশাল ব্যবধান কেন্দ্রটির বর্তমান সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের চাহিদার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের মধ্যেও কর্তৃপক্ষ টিনের ছাউনির নিচে টিকাদান কর্মসূচি এবং নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টাকে অবশ্যই প্রশংসনীয় বলা যায়। তবে এই অস্থায়ী ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে নারীদের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা, পরিচ্ছন্নতা ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

লুটতরাজ ও ভাঙচুরের ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত বা নিখোঁজ হয়েছে। এছাড়া রোগীদের জন্য বিশেষ বিছানা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম, অটোক্লেভ, ফ্রিজ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসকদের বসার স্থান থেকে শুরু করে ওষুধ সংরক্ষণের আসবাবপত্র পর্যন্ত সবকিছু নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। যেহেতু এগুলো স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার মৌলিক উপকরণ, তাই অবকাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি এসব সরঞ্জাম সংগ্রহ ও স্থাপনের কাজ এখনই শুরু করা প্রয়োজন। ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার পর সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করলে পূর্ণাঙ্গ সেবা ফেরাতে আরও দীর্ঘ বিলম্ব হবে।

পুলিশের জিম্মায় যে উদ্ধারকৃত সামগ্রীগুলো রয়েছে, সেগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা জরুরি। তবে উদ্ধার হওয়া মানেই যে প্রতিটি যন্ত্র পুনরায় ব্যবহারযোগ্য, তা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এই যাচাই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নতুন যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রস্তুতিও সমান্তরালে চলতে পারে। বিশেষ করে জরুরি সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে এই সংস্কারকাজ সম্পন্ন করাচ্ছেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে সরকার যদি নিজেই এই সংস্কার ও সেবা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব গ্রহণ করত, তবে সেটি আরও বেশি যথাযথ ও কার্যকর হতো। স্বাস্থ্যসেবা সচল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় কাজ ব্যক্তিগত অর্থায়ন কিংবা পরবর্তী সহযোগিতার আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে থাকা উচিত নয়। প্রয়োজন নিরূপণ, অর্থের সংস্থান এবং কাজ সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারেরই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

পরিশেষে, রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুনর্বাসনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মানুষ কত দ্রুত আগের মতো নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা ফিরে পাচ্ছেন, তার ওপর। সরকারের সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দ্রুত সংস্থানই এই লক্ষ্য পূরণের প্রধান শর্ত। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, রাড্ডা ট্রাস্ট এবং কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত একটি সমন্বিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ও টিকা সরবরাহের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, আসবাব এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা ও লুটপাটে যারা জড়িত ছিল, তাদের দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।