রাজধানীর মিরপুর ১ এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার পর পুলিশ লুট হওয়া যেসব মালামাল উদ্ধার করেছিল, সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্প্রতি বুঝে পেয়েছে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ। তবে উদ্ধার হওয়া ৩১ ধরনের মালামালের মধ্যে ওষুধ, টিকা ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বৈদ্যুতিক ও চিকিৎসাসেবার যন্ত্রপাতিগুলোও বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

রাড্ডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে যে সেগুলো মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব কি না। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, মেরামতের মাধ্যমে সেগুলো আবার ব্যবহার করা সম্ভব কি না। এ জন্য টেকনিশিয়ানদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবে কোন যন্ত্রপাতি মেরামত করা যাবে, তা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”

পুলিশের জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাড্ডা সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে একটি রেফ্রিজারেটর, দুটি সাইনবোর্ড, বিভিন্ন ধরনের এক বস্তা ওষুধ, চারটি রেজিস্টার, একটি স্টেথিসকোপ, বিভিন্ন দাপ্তরিক কাগজপত্র, এক বস্তা বিভিন্ন ধরনের টিকা, টিকার ১২টি রেজিস্টার এবং পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন নথিপত্রের অর্ধেক বস্তা। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে একটি অটোগ্রাফ যন্ত্র, একটি স্টিলের চেয়ার, একটি জিএমপি, তিনটি সিলিং ফ্যান, বিভিন্ন কাগজপত্র ও নথিসহ তিনটি ড্রয়ার, এক বক্স আলট্রাসনোগ্রাফির জেল, একটি এফপি ক্লথ, একটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, পাঁচটি প্লেট, একটি কালো স্কুলব্যাগ, কাচের ছয়টি গ্লাস ও একটি বড় চামচ।

উদ্ধার হওয়া অন্যান্য ইলেকট্রনিক মালামালের মধ্যে রয়েছে দুটি কম্পিউটার (পিসি), একটি অনলাইন ইউপিএস, একটি আলট্রা প্রিন্টার, একটি এইচপি প্রিন্টার, একটি ওজন মাপার যন্ত্র, মাল্টিপ্লাগ, মাউস, কিবোর্ড ও ইউপিএস, একটি লাইট স্ট্যান্ড, ডেল কোম্পানির একটি মনিটর, একটি স্যামসাং আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন এবং একটি জেনারেটর। এসব চিকিৎসা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে কোনগুলো মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব, তা যাচাই করছেন টেকনিশিয়ানরা।

আজ দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কার কাজ শেষ হওয়ায় ভবনটি ব্যবহার করা গেলেও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট রয়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন কক্ষে ভাগ করে সীমিত পরিসরে সেবা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সেবাপ্রার্থীদের নিবন্ধনের জন্য ভবনের বাইরে টিনের ছাউনির নিচে অস্থায়ী বুথ বসানো হয়েছে। সেখানে শিশুদের টিকাদানের পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনার প্রাথমিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া মাতৃ ও নারী স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ওই সেবাকেন্দ্রের চিকিৎসক শাহনাজ ইসলামি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁদের নিয়মিত সেবা কার্যক্রমের মধ্যে এখনো অ্যাডাল্ট ভ্যাকসিনেশন, বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগার, পরিবার পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সেবা এবং অস্ত্রোপচার কক্ষ চালু করা সম্ভব হয়নি।” তিনি আরও জানান, সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি সচল থাকলে দৈনিক গড়ে চার শতাধিক মা, নারী ও শিশুর সেবা দেওয়া সম্ভব হতো, তবে বর্তমানে আড়াই থেকে তিন শ জনের সেবা দেওয়া যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে একদল লোক রাড্ডা সেন্টারে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে প্রতিষ্ঠানটির ভবন, ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই ঘটনার পর কেন্দ্রটির স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং পরবর্তীতে সীমিত পরিসরে টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হয়।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। এরপর দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হয় এবং ১০ অক্টোবর কেন্দ্রটির মূল ভবন ব্যবহারের উপযোগী করে রাড্ডা কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে আসছে। ভাঙচুরের পর ভবন সংস্কার করে সেবা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও, উদ্ধার হওয়া অকেজো যন্ত্রপাতিগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা এবং নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।