ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। এদিন সকাল থেকেই ভোটারদের মন জয় করতে এবং নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। কেউ ছুটেছেন প্রত্যন্ত গ্রামে, কেউ আয়োজন করেছেন পথসভা, আবার কেউ জনসভার মাধ্যমে ভোটারদের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ রূপরেখা পেশ করেছেন। শেষ মুহূর্তের এই লড়াইয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রার্থীরা একে অপরের সাথে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত এই আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নিয়ম অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকাল আটটায় নির্বাচনী প্রচারণার সময়সীমা শেষ হচ্ছে।

বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ) এবং ১১-দলীয় জোটের অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) দিনভর এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে গণসংযোগ করেন। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের (হাতপাখা) সমর্থনে শহরের রাস্তায় বিশাল গণমিছিল করা হয়। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী আবদুল আলীম নিজামীর (বটগাছ) পক্ষে মাইকিং শোনা গেলেও বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুকের (ডাব) কোনো দৃশ্যমান প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়নি।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফয়সল আমীন গতকাল বেলা ১১টার দিকে রুহিয়া উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের চতুরাখোর গ্রামে একটি নির্বাচনী সভার মাধ্যমে তাঁর শেষ দিনের কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর তিনি ওই ইউনিয়নের দলুয়াপাড়া, শুকানীপাড়া এবং দেবীডাঙ্গাসহ মোট ৯টি এলাকায় গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করেন।

নির্বাচনী প্রচারণার এসব কর্মসূচিতে মির্জা ফয়সল আমীন তাঁর বড় ভাই এবং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সময়ে গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “তাঁর ভাই এমপি থাকার সময় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, দুটি নতুন উপজেলা গঠন এবং চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৬০০ শয্যায় উন্নীত করা, বন্ধ বিমানবন্দর চালু, ইপিজেড স্থাপন এবং গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।”

তিনি আরও দাবি করেন যে, এসব উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে ধানের শীষে ভোট দেওয়া প্রয়োজন। নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যেই এলাকার নর্দমা ও রাস্তাঘাট পাকা করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়া কৃষকদের সারসংকটের কথা উল্লেখ করে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করার কথা জানান তিনি।

বিকেল চারটায় ভুল্লী উপজেলার কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন মির্জা ফয়সল। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। এ ছাড়া জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারাও সেখানে বক্তব্য প্রদান করেন। জনসভা শেষে দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ধানের শীষের পক্ষে মিছিল করেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন সকালে দলীয় জেলা কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাঁর দিনের কর্মসূচি শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি সদর উপজেলার গড়েয়া এলাকায় গিয়ে গোপালপুর ও লস্করা গ্রামে গণসংযোগ করেন। পরবর্তীতে মোলানী, জগন্নাথপুর ও তেলীপাড়া এলাকায় তিনি গণসংযোগ ও পথসভা পরিচালনা করেন।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থা ছিল না। ৫ আগস্টের পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুটি উপনির্বাচনে আগের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সরকারি দলের লোকজন নির্বাচনী আচরণবিধি মানছেন না এবং দাঁড়িপাল্লার কর্মী-সমর্থকদের প্রচারণায় বাধা দেওয়ার পাশাপাশি পোলিং এজেন্টদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সবশেষে ভোটারদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কেউ যাতে ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে, সেদিকে ভোটারদের সতর্ক থাকতে হবে।” রাত পৌনে সাতটার দিকে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে মিছিল করা হয়।

অন্যান্য প্রার্থীদের প্রচারণার কথা বলতে গেলে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুলের পক্ষে দুপুরে ঠাকুরগাঁও শহরে এক গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি শহরের আর্ট গ্যালারি মোড় থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সাধারণ পাঠাগার চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজিত সমাবেশে দলের যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসউদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, শেখ মুহাম্মদ আল আমিন ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুনতাছির আহমাদ বক্তব্য দেন।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী আবদুল আলীম নিজামীর পক্ষে মাইকিং শোনা গেলেও বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুকের কোনো প্রচারণা চোখে পড়েনি।

উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ১৮ ধারা অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করতে হয়। সেই নিয়ম অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল আটটায় প্রচারণা শেষ হবে এবং এরপর কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না।