হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের দাবি অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এই বিশাল ভোটব্যাংকই এখন উপনির্বাচনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বালিয়া বাজারের ব্যস্ততায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। রাস্তার পাশে রিকশা ও ভ্যানের চালকেরা যখন অপেক্ষায়, তখন তাঁদের আলোচনার প্রধান বিষয় ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের হিসাব-নিকাশ। তাঁদের একজন আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, ‘তোমরা যাই কহ, ধানের শীষই জিতিবে।’ পাশে থাকা এক বৃদ্ধ পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘দাঁড়িপাল্লাক ফেলায় দেছেন?’ এই কথোপকথনের মাঝে হরেক চন্দ্র নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, ‘এইঠে জিতিবা গেলে হামারলার ভোট নাগিবেই।’

কিছুক্ষণ পর আড্ডাটি শেষ হলে হরেক চন্দ্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই আসনে দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই জয়ী হয়ে আসতেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যালাতো আওয়ামী লীগও নাই, নৌকাও নাই। বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যে লড়াই হছে। হামার (সনাতনী সম্প্রদায়) ভোট নাকি দুই দলেরই নাগে। দিন-রাত ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার লোক বাড়ি বাড়ি যাছে। ভোট চাহেছে। তাই হামরা একনা চাপত আছু।’

ভুল্লী উপজেলার বালিয়া বাজারের হরেক চন্দ্রের এই কথাগুলো যেন এই এলাকার অনেক ভোটারেরই মনের কথা। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এই আসনে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিক, সাধারণ ভোটার এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এবারের উপনির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট। আর ঠিক এই কারণেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিশেষ নজর এখন এই ভোটারদের দিকে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার পর এই আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)। তবে ভোটারদের ধারণা, মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে।

ভোটের নতুন সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে একসময় আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রভাব ছিল। বিগত ১১টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার জয়লাভ করেছেন। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন থেকে এই আসনে নতুন সমীকরণ শুরু হয়। বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, যাদের আওয়ামী লীগের প্রধান ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ভোটারদের সমর্থনই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ফলে হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে বিএনপি চায় গত নির্বাচনের ফলাফল ধরে রাখতে, আর জামায়াত চায় সেখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে।

সংখ্যালঘু ভোটাররা এবার কার পাশে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৪৯ জন, যাদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছিল ১ হাজার ৮৭৬টি ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৫০৯টি ভোট।

অন্যদিকে, দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের পশ্চিম অংশ ও বাগপুর এলাকার ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৭৫৯ জন। স্থানীয়দের মতে, এই দুটি কেন্দ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটারই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ২ হাজার ১৯৬টি ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৪৭৬টি ভোট। উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকার রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৩০ জন। সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ১ হাজার ৩৫৩টি ভোট পান এবং তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার দেলাওয়ার হোসেন পান ২২৯টি ভোট। এই সব কেন্দ্রেই বিএনপি তাদের অবস্থান ধরে রাখতে চায় এবং জামায়াত সেখানে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে।

নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত। তিনি বলেন, “দেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করে। এবারের উপনির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোটের পরে যেন কেউ ভয়ভীতি বা হামলার শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।”

সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন আবেগঘন ভাষায় বলেন, ‘আমার বাড়ি কালীবাড়িতে। সেখানকার মন্দিরের দেয়াল আমাদের জায়গার সীমানা। মন্দিরের আশপাশে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। আমাদের বাড়ির জবা ফুলে আপনাদের পূজা হয়। আবার আপনাদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতায় আমাদের অসুখ সারে। আমি এমনই একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে কখনোই আপনাদের ক্ষতি হতে দেব না।’

অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সে সময় আমরা তাঁদের পাশে ছিলাম। আমি নির্বাচিত হলে সেই হামলার প্রতিটি ঘটনার বিচার পাবেন। সেই দিনগুলোতে আমি যেমন তাঁদের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।’

নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, “ভোটাররা যাতে ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরও তারা এলাকায় অবস্থান করবে।”