ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ পাঠিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। আগামী ১৯ অক্টোবর সকাল ১১টার মধ্যে তাকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই অভিযোগের লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জানা গেছে, তিনি ইতোমধ্যে উক্ত শোকজের জবাব দাখিল করেছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সাদিয়া আফসানা রিমা এবং সিভিল জজ মো. তোসিকুল আলমের স্বাক্ষরিত নোটিশ থেকে এই বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ অক্টোবর রাতে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীপাড়া মসজিদে এশার নামাজ শেষে গণসংযোগ করার সময় দেলাওয়ার হোসেনকে বাধা দেওয়া হয় এবং তাকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনায় বিএনপি প্রার্থী ফয়সল আমীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে যুবদল নেতা মানিক, ছাত্রদল নেতা আল-আমিন ও আলমগীরসহ ১৫ থেকে ২০ জন অস্ত্রধারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেলাওয়ার হোসেনের নির্বাচনি এজেন্ট মোহাম্মদ আলমগীর এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।

শনিবার মির্জা ফয়সল আমীনের পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. এনতাজুল হক শোকজের লিখিত জবাব জমা দেন। উক্ত জবাবে অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। জবাবে বলা হয়, নির্বাচনে তার সম্ভাব্য বিজয় বাধাগ্রস্ত করতে এবং নির্বাচনি পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যেই এই অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া দাবি করা হয় যে, উল্লিখিত সময়ে তার কোনো নেতাকর্মী এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না।

নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বিএনপি প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থীসহ আরও তিনজনকে শোকজ করা হয়েছে। তারা হলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন, সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজু আলী এবং আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমান।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকে দেওয়া শোকজে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ও তার সমর্থকরা ভোটারদের বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহার করেছেন। জমা দেওয়া ভিডিও পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা, ২০২৫-এর ১৫(খ) বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এই কারণে তাকে ১৯ অক্টোবর বেলা ১১টায় ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের ২১১ নম্বর কক্ষে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে শিক্ষক জুলফিকার রহমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও পৌর যুব বিভাগের সভাপতি মো. রাজিউর রহমানের অভিযোগ, রুহিয়া উপজেলার সেনুয়া ইউনিয়নে বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয় উদ্বোধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বক্তব্য দিয়েছেন ওই শিক্ষক। এসব বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়েছে। আচরণবিধির ২১(ক) ও ২১(খ) বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।

একই সাথে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে গোপন বৈঠকের অভিযোগে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজু আলীকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে লিখিত জবাবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ৫ অক্টোবর রাতে তিনি ৩৮ জন সহকর্মীর সঙ্গে কোথাও একত্রিত হননি এবং ফয়সল আমীনের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি। তার দাবি, অভিযোগে উল্লেখিত সংগঠনটির কোনো অস্তিত্ব নেই এবং কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

দেলাওয়ার হোসেনের নির্বাচনি এজেন্ট মোহাম্মদ আলমগীর জানান, তাদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তারা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছেন। রাজিউর রহমানও শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দাবি করেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত জবাব ও তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৩ জন, নারী ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসন ছেড়ে দেওয়ায় আগামী ২৯ অক্টোবর এখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।