ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, লড়াই মূলত দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকি তিন প্রার্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরিচিতি নেই বললেই চলে।
সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সীতা পাল তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “এ মাসের ২৯ তারিখে ভোট বলে শুনছি, পাঁচজন প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন। আমরা শুধু জামায়াত আর বিএনপির প্রার্থীকে দেখেছি। আর কেউ আসেননি। বাকি তিনজন যে দাঁড়িয়েছেন, তাদের চেনা তো দূরের কথা, নামও ঠিকমতো জানি না। কোনো দিন আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেননি। তাদের ব্যানার নেই, মাইকিংও নেই। তাদের না চিনলে, না জানলে কাকে ভোট দেব? বিএনপি আর জামায়াতের যে দুজন ভোট চাইতে এসেছেন, তাদের একজনকে ভোট দিতে হবে। দুজনই ভালো মানুষ। কথা দিয়েছেন, আমাদের পাশে সব সময় থাকবেন।”
সীতা পালের মতো আরও অনেক ভোটারই এই উপনির্বাচনের বাকি তিন প্রার্থী সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রার্থী ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করছেন না এবং তাদের কোনো প্রচার কার্যক্রম নেই। মাঠে কোনো ব্যানার-ফেস্টুন বা মাইকিংয়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
প্রতীক বরাদ্দের পর গত ৮ অক্টোবর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচার শুরু করেছেন। শহরের প্রধান সড়ক, পাড়া-মহল্লা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এই দুই দলের পোস্টার ও ব্যানারের ভিড় দেখা গেলেও অন্য কোনো দলের প্রচারসামগ্রী চোখে পড়েনি।
উল্লেখ্য, এই আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন— রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের ভোটার আকাশ রহমান জানান, বেশ কয়েক দিন ধরে এলাকায় ভোটের আমেজ চলছে। তার মতে, এবার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি, কারণ দুজন শক্তিশালী প্রার্থী মাঠে আছেন। তবে বাকি তিন প্রার্থীর কথা তিনি কেবল খবর এবং ফেসবুকে দেখেছেন, বাস্তবে তাদের দেখেনি।
নারগুন ইউনিয়নের ভোটার আখি আক্তার বলেন, “দুই প্রার্থীর কোনো না কোনো কর্মী প্রতিদিন আমাদের এলাকায় ভোট চাইতে আসছেন। উঠান বৈঠক করছেন, কী কী উন্নয়ন হবে, সেসব কথা বলছেন। কিন্তু বাকি তিনজন প্রার্থী আসেননি, এমনকি তাদের কোনো কর্মীও একদিনের জন্য আসেননি। তাদের কর্মী আছে কি না, তা-ও জানি না আমরা। এই দুই দলের যেকোনো একজনকে ভোট দেব, যাতে আমাদের জেলার উন্নয়ন হয়, শান্তিতে থাকতে পারি।”
পৌরসভার হাজিপাড়ার বাসিন্দা আবু তাহেরের মতে, মির্জা ফয়সল আমিন বর্তমানে এগিয়ে আছেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে জেলা ও উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইছেন। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থীও বেশ জনপ্রিয়। ফলে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে তিনি মনে করেন।
সরকারপাড়ার ভোটার শাকিব হোসেন বলেন, “চারদিকে শুধু ধান আর দাঁড়িপাল্লার স্লোগান। শহরের সব জায়গা ধান ও দাঁড়িপাল্লার ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে। আর যে তিনজন প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন, তাদের আমরা পৌরসভার ভোটাররা চিনি না। এখন পর্যন্ত ভোট চাইতেও আসেননি। জনগণের কাছে ভোট না চাইলে তারা কীভাবে ভোট পাবেন? ভোটারদের কাছে যেতে হবে, জেলার কী কী উন্নয়ন করবেন, সেগুলো বলতে হবে। তাদের একদিনও আমরা দেখিনি। আমার মনে হয়, তারা শুধু শখ করে এমপি নির্বাচন করছেন।”
নির্বাচনী জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী জেলা বিএনপির সভাপতি পয়গম আলী। তিনি বলেন, “বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। আমরা জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে কথা বলছি। তারা আমাদের দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। যেহেতু আমাদের দল ক্ষমতায়, তাই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে তারা আমাদের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।”
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, “আমার দল ক্ষমতায়, তাই ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। বিজয়ী হলে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করব। এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন এবং নিজেদের অধিকার নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নও আমার লক্ষ্য।”
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মো. বেলাল উদ্দিন প্রধান জানান, তারা দিন-রাত এক করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। তিনি দেলাওয়ার হোসেনকে একজন মজলুম ও সৎ নেতা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, জনগণের জন্য আসা বরাদ্দ তিনি নিজের পকেটে ভরবেন না, বরং মানুষের জন্য কাজ করবেন। তাই জয়ের ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চিত।
জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, “আমি আশাবাদী, আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, লুটপাট ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে বিজয়ী করবেন। আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বিজয়ী হলে এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। আধুনিক ঠাকুরগাঁও গড়তে ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেবেন।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “ভোট একটি আমানত। তাই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভোট দিলে এর ভোগান্তি সাধারণ মানুষকেই পোহাতে হবে।”
আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঠাকুরগাঁও সদর, নবগঠিত রুহিয়া ও ভুল্লী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।