বার্সেলোনার উত্তর দিকে অবস্থিত মোলেত দেল ভালেস নামের একটি ছোট্ট শহর। সেই শহরের অলিগলিতে ফুটবল খেলতে অভ্যস্ত ছিল এক ছোট্ট মেয়ে। তার বাড়িতে টেলিভিশন পর্দায় প্রায় সারাক্ষণ ফুটবল খেলা চলত। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কাটত তার সময়। পাশাপাশি রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবল তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত। সুযোগ পেলেই সে ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে, কেবল বার্সেলোনার খেলা দেখার জন্য।
সেই ছোট্ট মেয়েটিই একদিন বার্সেলোনার রানি হয়ে উঠলেন। তিনি হলেন আলেক্সিয়া পুতেয়াস। ফুটবল বিশ্বে তাকে ‘লা রেইনা’ বলে ডাকা হয়, যার স্প্যানিশ অর্থ হলো ‘রানি’। তবে রানির জীবনেও দুঃসময় আসে, মুকুট হারানোর ভয় থাকে এবং কখনো কখনো সিংহাসনটাই নড়ে যায়। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল ঠিক তেমন এক কঠিন সময়। ২০২২ সালে হাঁটুর এক ভয়াবহ চোট তার পুরো ক্যারিয়ারকেই প্রায় শেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর সেই পুতেয়াস আবারও বিশ্বসেরা হয়ে ফিরে এসেছেন। তৃতীয়বারের মতো জয় করলেন মেয়েদের ব্যালন ডি’অর।
৩২ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার এবার তার স্বদেশি আইতানা বোনমাতির রেকর্ড স্পর্শ করলেন। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার এই পুরস্কার জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বসেরার মুকুট পরেন বোনমাতি। এবার আবারও সেই মুকুট পুতেয়াসের মাথায়। মনে হচ্ছে, মেয়েদের ফুটবলে ব্যালন ডি’অর যেন স্পেনের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। টানা ছয় বছর এই পুরস্কার স্প্যানিশ ফুটবলারদের হাতেই যাচ্ছে। ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র্যাপিনো ছাড়া অন্য কোনো দেশের ফুটবলার এই গৌরব অর্জন করতে পারেননি।
তবে পুতেয়াসের এবারের এই জয় কেবল একটি ট্রফি জেতার গল্প নয়; এটি যেন একজন হারিয়ে যাওয়া শিল্পীর পুনরায় তার রংতুলি ফিরে পাওয়ার এক অনন্য কাহিনি। ২০২২ সালের ইউরোর ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) গুরুতর চোট পান পুতেয়াস। ফলে ইউরোতে খেলার সুযোগ পাননি তিনি। সেই বছর দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর জিতলেও মাঠে তার আগের সেই প্রভাব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০২৩ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জয় করলেও সেই ঐতিহাসিক সাফল্যে পুতেয়াসের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমিত। যে ফুটবলার একসময় দলের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হতেন, তাকেই বিশ্বজয়ের উৎসবে অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকতে হয়েছিল।
সেই সময়ে তার অনুভূতি কেমন ছিল? হয়তো ভেতরে ভেতরে তিনি পুড়েছেন, নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন যে আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি ধীরে ধীরে মাঠেই দিয়েছেন। ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করেন তিনি। পরের মৌসুমে তার পারফরম্যান্স আরও উন্নত হয়। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফুটবল বিশ্ব পুরোনো পুতেয়াসকে পুরোপুরি ফিরে পায়। বার্সেলোনার হয়ে চারটি ট্রফি জেতার পাশাপাশি অধিনায়ক হিসেবে দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দেন তিনি। বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের আক্রমণ সাজানোর বড় দায়িত্বটি নিতে হয় তাকে, যা তিনি রানির মতোই সফলভাবে পালন করেছেন।
পুতেয়াসের ফুটবলকে কেবল গোলের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তিনি যেমন গোল করেন, তেমনি গোল করান। মাঝমাঠ থেকে তার দেওয়া পাস প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণভাগকে এলোমেলো করে দেয়। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ২১টি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের জন্য ১৩টি অ্যাসিস্ট করেছেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে গোলসংখ্যায় তিনি তৃতীয় এবং অ্যাসিস্টে দ্বিতীয়। চ্যাম্পিয়নস লিগেই তার গোল সংখ্যা ৭টি। বার্সেলোনা ছয় মৌসুমে চতুর্থবারের মতো ইউরোপিয়ান শিরোপা জিতেছে। এই প্রতিযোগিতায় তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডার (৮), যাদের তিনজনই মূলত স্ট্রাইকার। অথচ পুতেয়াস একজন মিডফিল্ডার।
টানা সপ্তমবার স্প্যানিশ লিগ জয়ী বার্সেলোনার হয়ে লিগে ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি, যা যৌথভাবে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ। ওপেন প্লে থেকে ৪০টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি, যা লিগে চতুর্থ সর্বোচ্চ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে শটে শেষ হওয়া আক্রমণের ধারায় পুতেয়াসের অংশগ্রহণ ছিল ১৫১ বার। তার উপরে ছিলেন কেবল ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুতেয়াস ৮৯টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, যার মধ্যে ১৯টি ছিল বড় সুযোগ। আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে তিনি সফল পাস দিয়েছেন ৯৬৫টি। স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ মিলিয়ে এই দুই হিসাবে তার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না কেউ।
চ্যাম্পিয়নস লিগে একাই ৩৬টি সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। বায়ার্ন মিউনিখের ক্লারা বুল ছাড়া আর কেউ এত সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। ২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটাই সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে পুতেয়াস কেবল ফিরে আসেননি, বরং নিজের পুরোনো শ্রেষ্ঠত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই তিনি সেরা হয়েছেন। দ্বিতীয় হয়েছেন বার্সেলোনার স্ট্রাইকার এভা পায়োর এবং তৃতীয় হয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ।
পুতেয়াসের জন্ম বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে। রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতেই তার বেড়ে ওঠা। একসময় জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন তিনি। স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেলেতে খেলার পর বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায় এক বছর কাটান। তবে মেয়েদের দলটি ভেঙে যাওয়ায় তাকে বার্সেলোনা ছাড়তে হয়। এরপর তিনি এসপানিওল ও লেভান্তেতে খেলেন। অবশেষে ২০১২ সালে ফিরে আসেন তার শৈশবের ভালোবাসার ক্লাবে।
পরবর্তী ১৪ বছরে বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন ৩৮টি ট্রফি, যার মধ্যে ১০টি লিগ শিরোপা এবং চারটি ইউরোপিয়ান কাপ। যে মেয়েটি একসময় গ্যালারিতে বসে ইনিয়েস্তাদের খেলা দেখতেন, তিনিই হয়ে উঠলেন বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। তবে সব প্রেমের গল্পের শেষ এক রকম হয় না। ২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষে বার্সেলোনার সঙ্গে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। চাইলে তিনি থেকে যেতে পারতেন, কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জের ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে জোড়া গোল করে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের লায়নেসদের বিশ্বকাপে ওঠার আশা শেষ করার ঠিক পরের মাসেই তিনি নিজেই পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে।
ইংল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একাধিক প্রস্তাব পেলেও তিনি মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প লন্ডন সিটি লায়নেসেসকে বেছে নেন। জুলাইয়ে বার্সেলোনা ছেড়ে ইংলিশ উইমেনস সুপার লিগের এই ক্লাবে যোগ দেন তিনি। বিদায়ের সময় পুতেয়াস এবং তার ভক্তরা উভয়েই কেঁদেছিলেন। ১৪ বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ ছিল না। তবু জীবন থেমে থাকে না।
আগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস বলেছিলেন, “আমি সব সময় আরও ভালো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকি। সে কারণেই এখানে এসেছি। মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে সব সময় এগিয়ে যেতে হয়।” নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে তিনি ৩টি গোল এবং ১টি অ্যাসিস্ট করেছেন। ৩২ বছর বয়সেও তার পায়ের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, তা এই সংখ্যাই বলে দেয়।
তবে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের পর পুতেয়াস যা বলেছেন, তা হয়তো তার গোল কিংবা ট্রফির চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। তিনি বলেন, “পৃথিবীর সব ছেলে ও মেয়েকে বলছি, তোমরা যদি ফুটবল ভালোবাসো, যদি ফুটবল খেলতে চাও, তাহলে খেলো। তুমি ছেলে না মেয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না। কোথা থেকে এসেছ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যদি বলে তুমি পারবে না, তার কথা শুনবে না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবে।”
তার এই কথাগুলো শুনলে মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়, যে রাস্তায় ফুটবল খেলত এবং ন্যু ক্যাম্পে বসে স্বপ্ন দেখত। তারপর একদিন তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন অন্যদের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। মাঝখানে এসেছিল ভয়ংকর চোট, হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং প্রিয় ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু রানি কি আর এত সহজে হারিয়ে যান!