প্রথম দফার নির্বাচনে পিছিয়ে থাকলেও নাটকীয়ভাবে পুনরায় জয়লাভ করেছেন ব্রাজিলের বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অন্যদিকে, সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিস নির্বাচনে নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে লুলার দৃঢ় অবস্থান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ভুচিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই দুই দেশের নির্বাচনী ফলাফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব বহন করছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসতে চলেছেন লুলা। উল্লেখ্য, ফ্লাভিও বলসোনারো হলেন ব্রাজিলের সাবেক কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর পুত্র।

গত রোববার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ভোটে প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে লুলার প্রাপ্ত ভোট ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট।

লুলার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কথা ঐতিহাসিকভাবেই জানা যায়। ২০১০ সালে পশ্চিম তীর সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, “আমি একটি ‘স্বাধীন ও মুক্ত ফিলিস্তিন’ দেখতে চাই।” তাঁর শাসনামলেই ব্রাজিল ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

নির্বাচনের প্রথম ধাপে ৪ অক্টোবর ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন লুলা, যা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি করেছিল। তবে দ্বিতীয় ধাপে সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়ে তিনি জয় ছিনিয়ে নেন। প্রথম ধাপে ভোট না দেওয়ার হার ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা দ্বিতীয় ধাপে কমে ১৯ দশমিক ২১ শতাংশে নেমে আসে। লুলার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মতে, ভোটারদের পুনরায় কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনাই তাঁর এই জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

লুলার এই জয় তাঁর ফিলিস্তিনপন্থী আদর্শকে আবারও সামনে এনেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতেরত অবস্থায় তিনি ‘কেফিয়াহ’ পরিধান করেছিলেন। সে সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “ফিলিস্তিনিদের আমাদের পূর্ণ মনোযোগ ও সংহতি প্রাপ্য।” একই সঙ্গে তিনি একটি “স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের” পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

২০১০ সালে পশ্চিম তীর সফরের সময়ও লুলা বলেছিলেন, “আমি একটি ‘স্বাধীন ও মুক্ত ফিলিস্তিন’ দেখতে চাই।” লুলার শাসনামলে ব্রাজিল ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে লুলার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; তিনি স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তাঁর আগের মেয়াদে ব্রাজিলের নিরাপত্তা বাহিনী ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে অস্ত্রচুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন এবং ইসরায়েলি পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে নিজেকে “ইসরায়েলের বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

লুলার এবারের জয়কে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হলেও, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ কতটা পরিবর্তন করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ, লুলা একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করেন।

অন্যদিকে, সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিস নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন। প্রাথমিক ফলাফলের প্রবণতা অনুযায়ী, বিরোধী জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে, যেখানে ভুচিসের দল পেতে পারে ১০৫টি আসন। সার্বিয়ার পার্লামেন্টে মোট আসন সংখ্যা ২৫০টি।

নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে ভুচিস নিজেই বলেন, “এটা স্পষ্ট, আমরা এ নির্বাচনে হেরে গেছি।”

ভুচিসের এই পতনের পেছনে গত দুই বছর ধরে চলা তরুণদের সরকারবিরোধী আন্দোলনের বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসেন তরুণেরা। সেই গণআন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।

এবারের নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ভোট পড়েছে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া বিলুপ্তির পর দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

ভুচিসের পরাজয়ের খবরে বেলগ্রেডের রাজপথে উল্লাসে মেতে ওঠেন বিরোধী সমর্থকেরা। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং আতশবাজি, নাচ-গান ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর। প্রায় ১৮ মাস ধরে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মধ্যবর্তী একটি পার্কে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির সমর্থকেরা যে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছিলেন, উত্তেজিত জনতা সেগুলো ভেঙে দেয়।

ইসরায়েলের সঙ্গে ভুচিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্বিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলি কোহেন বেলগ্রেড সফর করেন এবং মন্তব্য করেন যে, দুই দেশের সম্পর্ক “আবার সঠিক পথে” ফিরেছে। গত ১৪ বছরের মধ্যে কোহেনই ছিলেন তেল আবিবের প্রথম প্রধান কূটনীতিক যিনি বেলগ্রেড সফর করেন।

গাজা যুদ্ধের সময়ও সার্বিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে একই সময়ে দেশটি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ইসরায়েলে সার্বিয়ার অস্ত্র পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ভুচিস কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক নেতা নন; বরং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি দেশটির পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করেছেন। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে তিনি ইসরায়েলি লবির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছিলেন।

পরিশেষে, ব্রাজিলে ফিলিস্তিনপন্থী লুলার জয় এবং ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভুচিসের পরাজয়—দুটি ভিন্ন দেশের ঘটনা হলেও, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান টানাপোড়েনের এক ভিন্নধর্মী চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।