ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় গত রোববার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তবে চূড়ান্ত হিসাব আসার আগেই পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর শাসক আলেকসান্দার ভুচিস।

৫৬ বছর বয়সী আলেকসান্দার ভুচিস জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফলাফল যেদিকে যাচ্ছে তাতে এটি এখন স্পষ্ট যে, বিরোধী পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “চূড়ান্ত ফলাফল যেদিকে এগোচ্ছে তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন।”

ভুচিসের এই ভরাডুবির ফলে সার্বিয়ায় তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত সরকারবিরোধী সর্বাত্মক আন্দোলনের এক বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তরুণদের দ্বারা মনোনীত প্রার্থীরা এই আগাম নির্বাচনে পার্লামেন্টের চূড়ান্ত জয়ের পথে রয়েছেন।

ফলাফলের প্রাথমিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে গতকালই আলেকসান্দার ভুচিস জানান, বিরোধী জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাঁর নিজস্ব দল ১০৫টির মতো আসনে জয়ী হতে পারে। উল্লেখ্য, সার্বিয়ার পার্লামেন্টে মোট আসনের সংখ্যা ২৫০টি।

সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যানুসারে, রবিবারের এই সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ভোটার উপস্থিতির হার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিলুপ্তির পর এটিই দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির হার হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

চূড়ান্ত ফলাফল এখনো হাতে না আসলেও আলেকসান্দার ভুচিস স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁর পরাজয়। তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট, আমরা এ নির্বাচনে হেরে গেছি।”

বেলগ্রেডভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ‘ফোনেট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলেকসান্দার ভুচিসের পরাজয় স্বীকারের ঘোষণার পরপরই ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর কার্যালয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। সমর্থকেরা গান গেয়ে এবং নেচে উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন।

জোটের নির্বাচনী সদর দপ্তরে এক ভাষণে স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থী রাদোমির সাইসিস বলেন, প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় সব কেন্দ্রেই শিক্ষার্থীদের বাছাই করা প্রার্থীরা নিশ্চিতভাবে এগিয়ে আছেন।

আলেকসান্দার ভুচিসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশটির তরুণ ও শিক্ষার্থী সমাজ। মূলত সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ফসল হিসেবে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ সামনে এসেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাটি তরুণদের গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে এবং তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসেন।

রাদোমির সাইসিস তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, “শিক্ষার্থীরা জিতেছে। সার্বিয়ায় ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে, সে আশাও জিতেছে। আজ রাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক।”

২০১২ সালে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) প্রার্থী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আলেকসান্দার ভুচিস। এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় দেশটির রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন।

সার্বিয়ার আইন অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। এই সীমাবদ্ধতার কারণে আলেকসান্দার ভুচিস পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেই তিনি সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়লেন।

বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে পার্লামেন্ট ভবন এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মধ্যবর্তী একটি ছোট পার্কে প্রায় ১৮ মাস ধরে এসএনএস সমর্থকেরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। গতকাল সাধারণ মানুষ সেই তাঁবুগুলো ভেঙে দিয়েছেন।

ভোটদানের হার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিলুপ্তির পর সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ছিল এবার। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ এই হার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। ইউনিভার্সিটি অব বেলগ্রেডের গবেষক জেলেনা ভাসিলজেভিক গত শুক্রবার আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নিশ্চিতভাবে এসএনএসের একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে যাঁরা সাধারণত ভোট দেন না, তাঁদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে ভোটগ্রহণের সময় ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির নানা অভিযোগ উঠেছে। স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা সিআরটিএ জানিয়েছে, তারা ৫০০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে ভোটার বা নির্বাচনী কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটির মতে, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতা দেখা গেছে।

অন্যদিকে, ‘সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ নামক পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গতকাল বিকেল ৫টা নাগাদ তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ব্যালট পেপারের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট প্রদান এবং পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতার মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আলেকসান্দার ভুচিসের পরাজয় স্বীকারের পর পুরো সার্বিয়াতে বিজয়োৎসব শুরু হয়। বেলগ্রেডের আকাশ রঙিন আতশবাজিতে ঝলমল করে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ প্রধান সড়কে নেমে আসেন। স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ান এবং অনবরত হর্ন বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।

রাজপথে স্লোগান দেওয়া হয়: “আলেকসান্দার বিদায় নিয়েছেন”। তরুণেরা নেচে-গেয়ে তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জয় উদযাপন করেন। বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পাশে এসএনএস সমর্থকদের দীর্ঘ ১৮ মাসের তাঁবু অবস্থানটি জনতা ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।