ইউরোপীয় দেশ সার্বিয়ায় আগামীকাল রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পার্লামেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচ এই নির্বাচনের প্রাক্কালে তরুণ প্রজন্মের তীব্র আন্দোলনের মুখে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। এই চ্যালেঞ্জের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইলিজা সারদানোভিচ, যিনি পেশায় একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক।
২০১২ সালে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) প্রার্থী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আলেকসান্দার ভুচিচ। এরপর থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশটির রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।
তবে এবারের নির্বাচনে এক ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনরত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রার্থী না হয়েছেন, বরং সার্বিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদভিত্তিক শিক্ষার্থী সম্মেলনের মাধ্যমে ২৫০ জনকে প্রার্থী করা হয়েছে, যাকে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ বলা হচ্ছে। এই তালিকায় শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ এবং খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন, যাদের অধিকাংশেরই আগে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই।
দেশটির আইন অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছেন আলেকসান্দার ভুচিচ। আর সেখানেই তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন রাজনৈতিক জোটের শীর্ষ প্রার্থী ইলিজা সারদানোভিচ।
গত দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে এই ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর জন্ম। মূলত সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তরুণেরা রাজপথে নামেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
নির্বাচনী লড়াইয়ে এই নতুন ধারার প্রার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতাশূন্যতাকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখছেন। নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলেক্সান্দ্রা বলেন, “আমরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা মানুষদের একত্র করেছি। আমরা মনে করি, দেশ পরিচালনার জন্য তাঁরা যথেষ্ট যোগ্য।” তিনি আরও জানান, তাঁরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছেন যেখানে বাক্স্বাধীনতা থাকবে এবং গভীর রাতেও মানুষ নির্ভয়ে হাঁটতে পারবে, কোনো উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তির দ্বারা আক্রান্ত হবে না।
তালিকার শীর্ষে থাকা অধ্যাপক ইলিজা সারদানোভিচ বিবিসিকে বলেছেন, “আমার পক্ষ থেকে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ন্যায্য লড়াইয়ে সহায়তা করা খুবই স্বাভাবিক।” তিনি আরও বলেন, “আমরা নাগরিকদের সামনে সভ্য সমাজের মূল্যবোধগুলো তুলে ধরছি। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের এসব মূল্যবোধ থেকে দূরে রেখেছে।”
৫৬ বছর বয়সী আলেকসান্দার ভুচিচ গত মাসে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তিনি পার্লামেন্টে প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছার কথা জানান। যদিও ক্ষমতার মূল কেন্দ্র তাঁর হাতেই রয়েছে এবং অধিকাংশ গণমাধ্যম তাঁর ভাবমূর্তিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে, তবে স্টুডেন্ট লিস্টের দাবি—ভুচিচ ও এসএনএস রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
ভুচিচের প্রতি এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের সমর্থন রয়েছে। অনেকে তাঁকে একজন শক্তিশালী নেতা মনে করেন, যিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সফল হয়েছেন। তবে তিনি তরুণদের এই আন্দোলনকে ‘বিদেশি মদদপুষ্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং দাবি করেছেন এর লক্ষ্য হলো ‘রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা’। নির্বাচনী প্রচারের শেষ সমাবেশে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “আসুন, আমরা সব সময় আমাদের রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এবার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। যদিও স্টুডেন্ট লিস্টের কোনো সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব কাঠামো নেই এবং ইলিজা সারদানোভিচ জয়ী হলেও প্রধানমন্ত্রী হবেন কি না তা নিশ্চিত নয়, তবুও তাঁদের জনসমর্থন চোখে পড়ার মতো।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৩ সালের নির্বাচনে সরকারি সম্পদ ও গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের কারণে ক্ষমতাসীনেরা একচ্ছত্র সুবিধা পেয়েছিলেন। এদিকে রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পাশে একটি পার্কে ১৮ মাস ধরে এসএনএস সমর্থকরা তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছেন। ভুচিচ একে ‘ভিন্নমত সহ্য করতে না পারা’ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধের প্রতীক’ বলে দাবি করেছেন, যদিও সেখানে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।
ভুচিচের জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নোভি সাদের রেলস্টেশন দুর্ঘটনা। বেলগ্রেড থেকে বুদাপেস্ট উচ্চগতির রেলপথ প্রকল্পের আওতায় সংস্কারকাজ চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটে, যা তাঁরই একটি প্রধান প্রকল্প ছিল। ফলে এর দায় এড়ানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির বিশ্লেষক মাগদা আনাস্তাসিয়েভিচ মনে করেন, আগে ভুচিচ বলির পাঁঠা বানিয়ে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতেন, কিন্তু এই ঘটনায় তা সম্ভব হয়নি।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ভুচিচ একদিকে ইইউ-এর সঙ্গে আলোচনা এবং অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, স্টুডেন্ট লিস্ট ক্ষমতায় এলে এই সম্পর্কগুলো নষ্ট হতে পারে। এক সমাবেশে তিনি বলেন, “আপনি যখন তাদের মস্কোর ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তারা চুপ করে থাকে। ইতস্তত করে, কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না।”
তিনি আরও বলেন, “চীনের নেতারা কী ভাবছেন, তা আপনারা জানেন। ভ্লাদিমির পুতিন কী বলেছেন, তা-ও শুনেছেন। এবার সিদ্ধান্ত আপনাদের। ভাবুন, কারা সত্যিকার অর্থে আপনাদের স্বার্থের কথা ভাবেন।”
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে একদিকে যেমন বেলগ্রেড অ্যারেনায় ভুচিচের একক সমাবেশ হয়েছে, অন্যদিকে সাভা নদীর অপর পাশে স্লাভিয়া স্কয়ারে স্টুডেন্ট লিস্টের সমাবেশে প্রায় লাখ দেড়েক মানুষ জড়ো হয়েছেন। একদিকে শক্তিশালী একক নেতৃত্ব এবং অন্যদিকে সম্মিলিত নেতৃত্বের লড়াইয়ে এখন সার্বিয়ার ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।