ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে চার বছর আগের সেই নাটকীয় নির্বাচনের স্মৃতি এখনো অম্লান। সেই নির্বাচনে বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন জইর বলসোনারোকে। নির্বাচনের পর বলসোনারোর অনুসারীরা কংগ্রেস ভবনে যে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, তার প্রভাব দেশটির জাতীয় জীবনে এখনো গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন সাবেক প্রেসিডেন্টের পুত্র এবং কট্টর ডানপন্থী নেতা ফ্লাভিও বলসোনারো।
২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো। বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী বলসোনারো গৃহবন্দী এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। এমনকি জনসমক্ষে কোনো বক্তব্য দেওয়ার ওপরও তাঁর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এসব আইনি বাধা সত্ত্বেও বর্তমান নির্বাচনে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট।
ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন জানাতে জইর বলসোনারোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি একটি অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও আইনজীবীদের দাবি, এই কাজে জইর বলসোনারোর কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি, তবে ফ্লাভিও যে তাঁর বাবার সমর্থন লাভ করছেন, তা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই।
এবারের নির্বাচনে মোট ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে এখন পর্যন্ত কেবল লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ফ্লাভিও বলসোনারো ১০ শতাংশের বেশি সমর্থন অর্জন করেছেন।
বিবিসি ব্রাজিলের করা একটি জরিপে দেখা গেছে, এই দুই প্রার্থীর সম্মিলিত সমর্থন প্রায় ৪০ শতাংশ, যার মধ্যে লুলা সামান্য এগিয়ে আছেন। অন্য কোনো প্রার্থী ৪ শতাংশের বেশি সমর্থন পাননি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোটে কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশ না পেলে, সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লড়বেন।
ব্রাজিলে এবারের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৯ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি যে তাঁরা কাকে ভোট দেবেন। কেউ কেউ ব্যালট ফাঁকা রাখা বা বাতিল করার পরিকল্পনা করছেন। এই পরিস্থিতির কারণে প্রথম দফাতেই কোনো প্রার্থী সরাসরি জয়লাভ করার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
৮০ বছর বয়সী লুলা এর আগে তিনবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপর তুলে আনায় তিনি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হন। দুর্নীতির মামলায় ১৮ মাসের বেশি সময় কারাগারে কাটানোর পর ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল হয়, যার ফলে তিনি পুনরায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান।
আমাজন বন রক্ষায় লুলার ভূমিকা প্রশংসিত হলেও, আমাজন নদীর মোহনার কাছে তেল অনুসন্ধানের পক্ষে তাঁর অবস্থান পরিবেশবাদীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে লুলার যুক্তি হলো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ব্রাজিলের রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তেল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, তাঁর শাসনামলে ২০২৬ সালে বন উজাড়ের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ট্রাম্পের ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লুলা বলেছেন, “ব্রাজিল কারও বাড়ির পেছনের উঠোন নয়।”
অন্যদিকে, ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবার রাজনৈতিক আদর্শের পথেই হাঁটছেন। তিনি বাবার সমর্থকদের পাশাপাশি কট্টরপন্থী খ্রিষ্টান এবং কৃষি ব্যবসায়ীদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। বাবার গৃহীত নীতিগুলো অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ফ্লাভিও। তিনি অপরাধীদের দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি প্রদান এবং অস্ত্র আইনের আরও শিথিলকরণের পক্ষে কথা বলেছেন। পাশাপাশি কৃষকদের ওপর থেকে অপ্রয়োজনীয় সরকারি বিধিনিষেধ সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার যেসব ঘটনা ঘটছে, ফ্লাভিও তা স্বীকার করলেও তাঁর মতে, এসব ঘটনা প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রেরই অংশ।
নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন অনুগত মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন ফ্লাভিও। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ নামক অপরাধবিরোধী জোট গঠনের উদ্যোগে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।