ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর পুত্র ফ্লাভিও বলসোনারো। স্থানীয় সময় রোববার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেল থেকে ফলাফল আসতে শুরু করে।

চলতি নির্বাচনে মোট ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে লড়াই মূলত সীমাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট গণনার পর দেখা গেছে, ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৫০ দশমিক ৭৪ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে লুলা দা সিলভা পেয়েছেন ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট।

তবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হতে এখনো বেশ কিছুটা সময় লাগবে। কারণ ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলো, যেখানে বলসোনারো-বিরোধী মনোভাব প্রবল, সেখানকার ভোট আগে গণনা করা হচ্ছে। বিপরীতে লুলার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভোট গণনার গতি তুলনামূলক ধীর।

নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীই প্রথম দফায় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন জনমত জরিপে আভাস পাওয়া গেছে যে, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা হবে।

নির্বাচনী প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুর্নীতি, অর্থনীতি এবং অপরাধের মতো বিষয়গুলো। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ঋণের চাপ ভোটারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি রাস্তায় ক্রমবর্ধমান অপরাধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।

লুলার শাসনকালে বৈষম্য ও বেকারত্বের হার হ্রাস পেলেও, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া ভোটারদের আস্থা অর্জনে তিনি বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো সাধারণ মানুষের এই অর্থনৈতিক উদ্বেগকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। বিপরীতে লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সামাজিক কল্যাণমূলক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারিবারিক ঋণের বোঝা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। লুলার মিত্ররা আশঙ্কা করছেন, তিনি জয়ী হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই ফলাফল মেনে নাও নিতে পারে। যদিও ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করেননি, তবে তিনি ফ্লাভিও বলসোনারোকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা করেছিলেন।

ব্রাজিলের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগে ফ্রান্স ও জার্মানির একটি প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কথিত হস্তক্ষেপের বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় দুর্নীতির বিষয়টিও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া 'ব্যাংক মাস্টার'-কে কেন্দ্র করে ঘটা কেলেঙ্কারিতে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িয়ে পড়েছেন। ব্যাংকটির সাবেক প্রধান ড্যানিয়েল ভোরকারোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে কয়েক শ কোটি ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তকারীরা ফ্লাভিও বলসোনারোর সঙ্গে ভোরকারোর সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত চলছে, যদিও তিনি সব ধরনের অন্যায় করার কথা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে ফ্লাভিও স্বীকার করেছেন যে, তাঁর বাবাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভোরকারোর কাছ থেকে কয়েক লাখ ডলার নিয়েছেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি রোববার ব্রাজিলের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫১৩টি আসন এবং সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ আসনেও ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নির্বাচনগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।