ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের অবরুদ্ধ হেবরন শহরে ব্যাপক আকারে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এই অভিযানের ফলে শহরের বেশ কিছু অংশ এখন পুরোপুরি ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গত শুক্রবার এক বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই হেবরনে এই ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। উল্লেখ্য, ওইদিন দুই ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর পাশাপাশি সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত দুই ফিলিস্তিনিও নিহত হন।

ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করে স্বাধীন সাংবাদিক জ্যাসপার নাথানিয়েল আল–জাজিরাকে জানিয়েছেন, হেবরন এখন ‘ভুতুড়ে শহরে’ পরিণত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সব বাসিন্দাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, হামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নিহত দুই ফিলিস্তিনি যে পাড়ায় বসবাস করতেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেই ‘পুরো পাড়া’ তছনছ করে দিয়েছে। সেখানকার পরিবারগুলোকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বাড়িগুলোর গায়ে ‘এক্স’ চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে।

যে তল্লাশিচৌকিতে ওই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল, তার আশপাশের বাড়িঘরগুলোও গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে পরিবারগুলোকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয় বলে জানা গেছে।

সেনাবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে নাথানিয়েল আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনী নিজেরাই জানে না, এখানে তারা কী করছে। আমরা এখানে মূলত সেনাদের দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখছি।’

অন্যদিকে, আল–জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ মনে করেন, হেবরনে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানের পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং তিনি হেবরন শহরেই অবৈধভাবে বসবাস করেন। এছাড়া বসতিবিষয়ক মন্ত্রীও হেবরনের একজন বসতি স্থাপনকারী। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর তাঁরা এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন এবং নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, তাঁরা সেই উদ্দেশ্যেই সফল হয়েছেন।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচও একজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী, যদিও তিনি হেবরনের বাসিন্দা নন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, অবিলম্বে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ তিনি নিজেই দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক অভিযানটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছে, যা একটি নির্দিষ্ট আদর্শগত চূড়ান্ত লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা। আর সেই লক্ষ্যটি হলো সম্পূর্ণ হেবরন দখল করা। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ফিলিস্তিনি এবং ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই হেবরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর।

বর্তমানে হেবরন শহরের ভেতরেই বসতি স্থাপনকারীরা অবস্থান করছেন এবং সেনারা বিভিন্ন পাড়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই পাড়াগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের ফলে এই সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং আদর্শগত বিভাজন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো আরও স্পষ্টভাবে সামনে চলে আসছে।