অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই অভিযানের ফলে হেবরনের আল-জালদা ও আইন দেইর বাহা এলাকার প্রায় ৩০০ পরিবারকে জোরপূর্বক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনীর এই অভিযানে পশ্চিম তীরজুড়ে মোট ৭০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি অধিকার রক্ষা সংগঠন প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৫টি এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রামাল্লা, জেনিন, নাবলুস, বেথলেহেম, জেরুজালেম, আল-বিরেহ ও বিরজেইত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই সাবেক বন্দী। এছাড়া মাঠপর্যায়ে আরও কয়েক শ মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতিমধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটি আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেছে, হেবরনের কয়েক শ বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের শহরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে। শুধু তাই নয়, তারা বেশ কিছু বাড়িকে সামরিক জিজ্ঞাসাবাদকেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছে।

রামাল্লা, জেনিন, নাবলুস, বেথলেহেম ও জেরুজালেমের পাশাপাশি অন্যান্য এলাকাতেও এই অভিযান চালানো হয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, যারা মুক্তি পেয়েছেন তাদের অনেকের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, চোখ বেঁধে রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে।

প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটির দাবি, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে এখন পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চমক অপেক্ষা করছে: নেতানিয়াহু

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) জন্য একটি ‘বড় চমক’ অপেক্ষা করছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলার পর তিনি বড় পরিসরে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।

শুক্রবার রাতে ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম আই২৪ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই নেতা বলেন, ‘এই নির্বাচনে আমাদের একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে হবে।’

আইনসভা নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতেই নেতানিয়াহুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা পিএ ভেঙে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর আছে কি না। তিনি সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘চমক ও অতর্কিত হামলার’ কৌশলই তাঁর পছন্দ।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘এই হুমকি নিষ্ক্রিয় করতে আমি কাজ করব। এমন কিছু পদক্ষেপ নেব, যেগুলো আপাতত গোপন রাখাই ভালো বলে মনে করি। তাতে চমকের উপাদানটা ধরে রাখা যাবে।’

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য আরেকটি বড় চমক আসছে উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা আরও দেশকে আব্রাহাম চুক্তিতে আনতে পারি। সেসব দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেবে না। কারণ, তারা জানে, আমরা তা মেনে নেব না। আর আমরা দুটির বেশি দেশের কথা বলছি।’ উল্লেখ্য, গাজায় জাতিগত নিধনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত রয়েছেন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিয়েছি। আমি বলেছিলাম পরিবর্তন আনব। আমরা ঠিক সেটাই করেছি।’

কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি হামাসের

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে হামাস জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলা হলো ‘আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে দখলদারদের অপরাধমূলক আগ্রাসনেরই সম্প্রসারণ’।

সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইসরায়েলের অপরাধমূলক নীতি, নৃশংসতা ও নিপীড়ন পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মাত্রায় উত্তপ্ত করছে। এই আগ্রাসন থামাতে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান ও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জরুরি।’

হামাস আরও দাবি করেছে, ‘এই অভিযান আমাদের অবিচল জনগণের মনোবল ভাঙতে পারবে না। নিজেদের ভূমি ও অধিকারের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারও টলাতে পারবে না।’

সংগঠনটির মতে, ‘দখলদার ও তাদের অপরাধী অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের অভিযান এবং আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে তাদের সহিংসতা বৃদ্ধি কেবল ক্ষোভই বৃদ্ধি করবে। প্রতিরোধের পথে অঙ্গীকার আরও দৃঢ় করবে।’

হেবরনের গভর্নর ও মেয়রের সঙ্গে কথা বললেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোস্তফা হেবরনের গভর্নর খালেদ দুদিন ও মেয়র ইউসুফ আল-জাবারির সঙ্গে কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার খবর অনুযায়ী, তাঁরা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি, ইসরায়েলি অভিযান এবং সেখানকার ফিলিস্তিনিদের জরুরি প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করেন।

ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে ‘নাগরিকদের জরুরি চাহিদা মেটাতে ও তাঁদের সহনক্ষমতা জোরদার করতে হাতে থাকা সব সম্পদ কাজে লাগানোর নির্দেশ’ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে রামাল্লার পূর্বে ইয়াবরুদ ও আল-মুগাইয়ির গ্রামে ঢুকে পড়েছে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। তারা ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে ভেড়া চড়িয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে বলে জানিয়েছে ওয়াফা। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ফিলিস্তিনিদের জমি দখলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এই গ্রামগুলোতে প্রবেশ করেছে।