ইসরায়েলে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যখন হামলা চালায়, তার আগাম সতর্কতা পাওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎস এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ হামলার প্রায় ১০ দিন আগেই নেতানিয়াহুকে একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি দ্য আটলান্টিক পত্রিকা জানিয়েছে, মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেল ব্যক্তিগতভাবে তেল আবিবে গিয়ে নেতানিয়াহুকে হামাসের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ২৫ সেপ্টেম্বর তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকে নেতানিয়াহু এই সতর্কবার্তাগুলোর কথা গোপন রেখেছিলেন।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নেতানিয়াহু তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র বিন জায়েদের সাথে দেখা করতে আবুধাবিতে যান। গত রোববার তিনি একটি গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে উড়াল দেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, বিমানবন্দরে এক ঘণ্টার এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য আরব দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সাথেও আলোচনা করা হয়।
জানা গেছে, ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু বিন জায়েদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন যেন সতর্কবার্তার খবরটি অস্বীকার করা হয়। তবে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতায় জড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন না। পরবর্তীতে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এই খবরটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি পরদিন নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন যে, তাঁর সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করতে শত্রু আরব দেশগুলো মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে।
গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের চালানো নৃশংস হামলার সময়েও আরব দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে ইসরায়েলের এই যোগাযোগ নতুন কিছু নয়। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত সেই বর্ধিত বৈঠকে এমন কিছু দেশও উপস্থিত ছিল যাদের সাথে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেখানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।
ইসরায়েলের একটি সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্যমতে, সে সময় মরক্কো, লিবিয়া ও কাতারের উড়োজাহাজ আবুধাবিতে অবতরণ করেছিল। উল্লেখ্য যে, এক বছর আগেই ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালিয়েছিল।
আরব সরকারগুলোর ধারণা, তারা ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং নিজ দেশের জনগণের মতামতকে আলাদা রেখে সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ, তারা একদিকে ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ সহায়তা পাঠাবে এবং মুখে ইসরায়েলের সমালোচনা করবে, কিন্তু একই সাথে ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা।
একইভাবে জর্ডান, বাহরাইন ও তিউনিসিয়ায় সরকারবিরোধীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে কোনো দেশেই জনগণের ক্ষোভ দীর্ঘকাল চেপে রাখা সম্ভব হয় না। গত সেপ্টেম্বর মাসে মরক্কোর তানজিয়ার শহরে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এই অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, আরব সরকারগুলো চরম ঝুঁকি নিয়ে ইসরায়েলের সাথে এই বিপজ্জনক সম্পর্ক বজায় রাখছে।
গাজায় হামলার পর থেকে নেতানিয়াহু দাবি করে আসছেন যে, আরব নেতারা গোপনে তাঁর নীতিসমূহকে সমর্থন করেন। ফলে এই গোপন সম্পর্কগুলো ফিলিস্তিনিদের অধিকার খর্ব করার পাশাপাশি ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আরও উৎসাহিত করছে।
অর্থনৈতিক তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার বাণিজ্য ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া মিসর ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সাথে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর মরক্কো ও ইসরায়েল পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। আব্রাহাম চুক্তির দেশগুলো এবং মিসর ও জর্ডান বহু বছর ধরেই এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু এখন সৌদি আরবকেও এই চুক্তির আওতায় আনার চেষ্টা করছেন। তবে সৌদি আরব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া তারা কোনো চুক্তিতে আসবে না। যদিও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট দাবি করেছে যে, আবুধাবির গোপন বৈঠকে সৌদি আরব ও জর্ডানের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, তবে সৌদি আরব ও জর্ডান এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এই ধরনের নীতির কারণে আরব নেতা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক মতামত জরিপে দেখা গেছে, আরব বিশ্বের ৮৭ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধী। মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দিতে রাজি। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ কেবল ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে নয়, বরং নিজ দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের সাথেও যুক্ত। যে সরকারগুলো নিজ দেশে দুর্নীতি ও দমন–পীড়ন চালায়, তারাই আবার ইসরায়েলের সাথে হাত মেলাচ্ছে।
আরব বসন্তের দেড় দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী গণ-অভ্যুত্থানের আতঙ্কে রয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি সম্প্রতি ২০১১ সালের বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকে আন্দোলনের পথ থেকে দূরে থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
একইভাবে জর্ডান, বাহরাইন ও তিউনিসিয়ায় সরকারবিরোধীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো দেশেই জনগণের ক্ষোভ স্থায়ীভাবে চেপে রাখা যায় না। গত সেপ্টেম্বর মাসে মরক্কোর তানজিয়ার শহরে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। অনিশ্চিত এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিষয় নিশ্চিত যে আরব সরকারগুলো চরম ঝুঁকি নিয়ে ইসরায়েলের সাথে এই বিপজ্জনক সম্পর্ক বজায় রাখছে।
— মোহাম্মদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউ ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সংবাদমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক।
(মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত)