যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও সেখানে ইসরায়েলের জাতিগত নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি স্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদনে এই গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে একে ‘অপতথ্য ছড়ানোর প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছে।

পূর্ব জেরুজালেমসহ অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং ইসরায়েল সংক্রান্ত জাতিসংঘের এই স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করেছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো এই তদন্তে গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘গাজার ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে জাতিগত নিধনের মতো অপরাধ অব্যাহত রেখেছে।’ প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, গাজার পাশাপাশি অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত কমিশনের অন্য একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল যে, ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নিধন চালিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা এই অপরাধে উসকানি দিয়েছেন। সে সময় ইসরায়েল এই ধরনের অভিযোগগুলোকে ‘কেলেঙ্কারি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলি মিশন বর্তমান প্রতিবেদনটির তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেছে, এটি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হেয় করার জন্য চালানো একটি অপতথ্য প্রচারণার অংশ। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন এক বিবৃতিতে বলেন, “জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েলের বৈধতা ক্ষুণ্ন করার এবং এর আত্মরক্ষা ও অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে।”

জনবহুল এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার

কমিশনের তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়েও ইসরায়েলি বাহিনী ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী গোলাবারুদ, ড্রোন, কোয়াডকপ্টার, আর্টিলারি ও স্নাইপার ফায়ার ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ (ইয়েলো লাইন), যা একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি সীমানা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা ক্রমশ গাজার আরও ভেতরের দিকে প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে এটি কার্যত (ডি ফ্যাক্টো) একটি সীমান্তে পরিণত হচ্ছে, যা গাজায় ইসরায়েলের ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণেরই প্রতিফলন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হওয়ার পর গাজায় শুরু করা ইসরায়েলের নৃশংস ও বর্বর আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করেছে যে, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সেখানে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিমান হামলায় ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হলেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ জনে।

কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা এবং বাড়িঘর ধ্বংস করার ঘটনা ফিলিস্তিনিদের উৎখাত ও বাস্তুচ্যুত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সালের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরিচালিত সামরিক অভিযানে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৩৪ হাজার ১৭৬ জন ফিলিস্তিনি এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।

তবে কমিশন কেবল ইসরায়েলেরই নয়, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষেরও (পিএ) সমালোচনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা ভিন্নমত পোষণকারী ফিলিস্তিনিদের নিশানা বানিয়েছে, যার ফলে অনেক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী নিহত ও আহত হয়েছেন।