রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় একটি গুদামে বিপুল পরিমাণ নষ্ট ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার মজুত থাকার খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই নষ্ট সার গুঁড়া করার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীরা ওই গুদামটি ঘেরাও করেন। তদন্তে জানা গেছে, গুদামটিতে মোট ৫৫৩ বস্তা নষ্ট টিএসপি সার রাখা ছিল।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের বালিয়াঘাটা সোনারপাড়া গ্রামের একটি বাড়ির পাশে অবস্থিত গুদামে। খবর পেয়ে গতকাল শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান পুঠিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রসনজিৎ সাহা। তাঁর উপস্থিতিতে গুদামের তালা খুলে তল্লাশি চালানো হলে সেখানে ৫৫৩ বস্তা টিএসপি সার উদ্ধার করা হয়।
এই বিষয়ে আজ রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পুঠিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এই সারের কোনো কার্যকারিতা আছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষা দরকার। যদি কোনো উপকারে আসে, তাহলে কৃষকদের কাছে বিক্রি করে সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। আর না হলে ধ্বংস করা হবে।” তিনি আরও জানান, সারের নমুনা পরীক্ষা করার জন্য ইতিমধ্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত ৫৫৩ বস্তা সার বর্তমানে স্থানীয় চেয়ারম্যানের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে এই সারগুলো আনা হয়েছিল। সারের মালিকের নাম মাইনুল ইসলাম, যিনি বানেশ্বর বাজারে ‘রহমান স্টোর’ নামে একটি মুদিদোকান পরিচালনা করেন। মাইনুল স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমানের কাছ থেকে গুদাম ভাড়া নিয়ে সেখানে সারগুলো মজুত করেছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সারগুলো আনার পর থেকেই এলাকার মানুষ সন্দেহজনকভাবে নজর রাখছিলেন। দেখা যায়, জমাট বেঁধে যাওয়া সারগুলো হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়া করা হচ্ছিল। এই দৃশ্য কেউ একজন কৌশলে ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। গতকাল বিকেলে স্থানীয় বাসিন্দারা গুদামটি ঘিরে ফেলেন। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রসনজিৎ সাহা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। স্থানীয়দের জোরালো দাবির মুখে গুদামের তালা খোলা হয়। আজ সকালে পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, এসময় সারের মালিক মাইনুল ইসলামও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গুদামের সামনে ভিড় করে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা এবং অনেকে ঘটনার ভিডিও করছেন। রাতে সারের মালিক উপস্থিত না থাকায় সহকারী কমিশনার সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ঘরে অবৈধ মাল আছে এই দাবির প্রেক্ষিতে আপনারা এসেছেন। সেই জায়গায় মালিকের স্বীকারোক্তির অভাবে যদি আপনারা চলে যান। সেই সঙ্গে এখানে যদি পাহারা না রাখেন এবং সিলগালা না করেন, তাহলে কিছু হয়ে গেলে এই দায়দায়িত্ব কে নেবে?”
এর জবাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রসনজিৎ সাহাকে বলতে শোনা যায়, “এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও থানার কর্মকর্তা আছেন। আমরা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে এসেছি। মামলা করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্য একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সারগুলো ভেজা এবং অধিকাংশ জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে। একজন ব্যক্তিকে হাতুড়ি দিয়ে সেই শক্ত সার ভাঙতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা একটি রসিদে ‘ডেলিভারি চালান, ভেজা/নষ্ট পণ্য’ শিরোনাম দেখা গেছে। ওই দলিলে উল্লেখ রয়েছে, এমভি মুনতাহা হোসেন নামের একটি লাইটার জাহাজ থেকে (নোঙর অবস্থায়) মি. ওসমানকে (আফসার) পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই রসিদে সাল সা বিলা শিপিং লাইনসের অ্যাকাউন্টস অফিসার আবদুল কাদেরের স্বাক্ষর রয়েছে।
সারের মালিক মাইনুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে মাইনুলের বরাত দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানান, মাইনুল কোনো সারের ডিলার নন এবং তাঁর সার আমদানির কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এই বিষয়ে তিনি কৃষি অফিসকেও অবহিত করেননি। মাইনুল দাবি করেছেন যে, তিনি নিজের পুকুর ও বাগানে ব্যবহারের জন্য এই সারগুলো এনেছেন। তবে মাইনুলের বাগান ও পুকুর কোথায়, সে বিষয়ে স্মৃতি রানী সরকার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেননি।