ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে কৃষি ব্যাংকের সোহাগী বাজার শাখা থেকে টাকা লুটের চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি কাওসার আহমেদ (২৪) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই জবানবন্দির পর পুলিশ ওই ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে।
আসামি কাওসার তাঁর জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, ব্যাংক লুটের এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনায় তাঁর সঙ্গে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামও যুক্ত ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাজহারুলকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ভল্টের তালা ভেঙে টাকা লুটের কথা ছিল। তবে বাঁধতে গিয়ে এক অসাবধানতায় মাজহারুলের হাত কেটে গেলে পুরো পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছমা আক্তারের আদালতে কাওসার এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এরপর আজ শনিবার সকালে পুলিশ ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী বাজার এলাকা থেকে নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তিনি সোহাগী ইউনিয়নের বৈরাটি গ্রামের প্রয়াত আবুল কাশেমের পুত্র এবং প্রায় তিন বছর ধরে ওই ব্যাংকে অস্থায়ী নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জবানবন্দির বিষয়টি নিশ্চিত করে ময়মনসিংহ আদালত পুলিশের পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান শনিবার দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “একজন আসামি গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে আরও দুজনের নাম এসেছে। তাঁদের মধ্যে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষীও আছেন।”
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে, যখন কাওসার আহমেদ সোহাগী বাজারের কৃষি ব্যাংক শাখায় টাকা লুটের চেষ্টা করেন। পুলিশ জানায়, পেশায় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি কাওসার প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ পেতে ব্যাংকে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঋণ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ রোমন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামি কাওসার জানিয়েছেন, ব্যাংক লুটের চেষ্টার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো ছিল। ব্যাংকে ঋণ নিতে গিয়ে কাওসারের সঙ্গে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামের পরিচয় হয়। এরপর বিভিন্ন সময় আড্ডা দিতে দিতে তাঁরা ব্যাংকে চুরির পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা ছিল—কাওসার ভল্টের টাকা লুট করবেন এবং নিরাপত্তারক্ষীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে চুরির নাটক সাজানো হবে, যাতে কারও সন্দেহ না হয়। পরে লুট করা টাকা দুজন সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।”
ওসি সাজ্জাদ রোমন আরও বিস্তারিত জানান, ব্যাংকে প্রবেশের পথ, তালা না কেটে শিকল কাটার কৌশল এবং দরজার সিটকিনি হালকা করে রাখার সব ব্যবস্থাই নিরাপত্তাকর্মী মাজহারুল করে দিয়েছিলেন। ঘটনার রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাওসার ব্যাংকে ঢুকে মাজহারুলকে বাঁধতে শুরু করেন। কিন্তু দড়ির বাঁধন অতিরিক্ত শক্ত হয়ে গেলে মাজহারুল তা কিছুটা ঢিল করতে বলেন। তখন চাকু দিয়ে দড়ির গিঁট আলগা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত পোঁচ লেগে মাজহারুলের হাত সামান্য কেটে যায়। হঠাৎ রক্ত দেখে মাজহারুল আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর মনে হয় যে সুযোগ বুঝে কাওসার হয়তো তাঁকে মেরে ফেলতে পারেন। এই সন্দেহের বশেই তিনি পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন এবং বাইরে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন, যার ফলে সবকিছু ভেস্তে যায়।
ওসি আরও বলেন, কোনো ধস্তাধস্তি ছাড়াই একজন ব্যক্তি একা কীভাবে ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে ফেললেন—বিষয়টি শুরু থেকেই সন্দেহজনক ছিল। পরবর্তী সময়ে চাকুর সামান্য পোঁচ ও জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। আপাতত তাঁদের দুজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এই ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
অন্যদিকে, নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল এই ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক। শনিবার বিকেলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিরাপত্তারক্ষী চিৎকার করে লোকজন জড়ো করেন এবং কাওসারকে ধরতে সাহায্য করেন। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে কাওসার জবানবন্দিতে তাঁর নাম বলে থাকতে পারেন।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
তবে ওসি সাজ্জাদ রোমন জানান, গ্রেপ্তারকৃত নিরাপত্তারক্ষী জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাঁর বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে মুঠোফোনের কল রেকর্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই রেকর্ড পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।