ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো সুপারিশ তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা আবেদনকারীকে সরিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন তিনি। এমনকি নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাঁকে উৎকোচ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন এই সংসদ সদস্য।

তবে এই অভিযোগের বিপরীতে জেলা প্রশাসকের দাবি, উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় কোনো ধরনের পরিবর্তন করা হয়নি। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় দ্বিতীয় স্থানেই ছিলেন।

আজ শুক্রবার দুপুর একটার দিকে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। তিনি তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘সরিষা ইউনিয়নে এ রকম লাইসেন্স যখন আমাদের ত্যাগী লোকদের বাইরে যায়, আর ফ্যাসিস্টের লোক—এই প্রকৃতির টাকা নিয়ে ঘোরা লোভী মানুষ যখন সবাইকে ডিঙিয়ে লাইসেন্স পায়, তখন উপজেলা ও জেলার সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘আমি সব জানি, এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইনি। কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।..আমাদের লোকেরা মামলা-হামলা খাবে আর আপনারা পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না।..কিসের রাজনৈতিক নেতাদের শুদ্ধি করবেন, সবার আগে প্রশাসনের লোকদের ওপর “অপারেশন ক্লিনহার্ট” চালানো দরকার।’

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১২ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। এই নিয়োগের জন্য জেলায় প্রায় ১ হাজার ৭০০টি আবেদন জমা পড়ে, যা যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত করা হয়।

আজ শুক্রবার সকালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে ময়মনসিংহ জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে জিয়া এন্টারপ্রাইজ। জেলা কমিটির সুপারিশে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল এক নম্বরে।

তবে সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ মুক্তকণ্ঠকে হোয়াটসঅ্যাপে উপজেলা থেকে জেলায় পাঠানো একটি তালিকা পাঠিয়ে দাবি করেন, সরিষা ইউনিয়নের জন্য সেখানে দুজনের নাম ছিল। প্রথম স্থানে ছিল জিওস্ট্রাক্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মালিক তাকলিমা আক্তারের নাম এবং দ্বিতীয় স্থানে ছিল জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউর রহমান ভূঁইয়ার নাম।

লুৎফুল্লাহেল মাজেদ তাঁর ফেসবুক পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, ‘সব জায়গায় তালিকায় থাকা এক নম্বর ব্যক্তিকেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরিষা ইউনিয়নে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে তালিকায় এক নম্বরে ছিল না। এখন যে নিয়োগ পেয়েছে, সে টাকা নিয়ে ঘুরেছে।..তালিকায় থাকা দুই নম্বর ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ইন্টারেস্ট (স্বার্থ) আছে। তা না হলে কেন এমন করা হবে? ...উপজেলা থেকে তালিকা আসলেও ডিসি এটা চেঞ্জ করেছেন, এমনকি ইউএনও তলেতলে কলকাঠি নেড়েছেন।’

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জিয়াউর রহমান নিজেকে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আবেদন করার পর মুঠোফোনে কথা বলে সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাউকে একটি টাকাও ঘুষ দিইনি। জেলা প্রশাসনের কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করিনি।’

এদিকে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘যিনি বাদ গেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কোনো ঘাটতি ছিল। তালিকায় থাকা দুই নম্বর ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন—তাঁর কী ঘাটতি ছিল।..নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার বাইরে কোনো কিছু করা হয়নি। সংক্ষুব্ধ যে কেউ হতেই পারে।’

ঈশ্বরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান জানান, ‘শুধু জেলা প্রশাসক স্যারকে মুঠোফোনে জানিয়েছিলাম, দ্বিতীয়জন আমার কাছে অভিযোগ দিয়ে গেছে প্রথমজনের আয়কর রিটার্ন নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক ছিল। বিষয়টি সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছিল।’