গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের অভিযোগে এখন খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে বাবা শাহজালাল রুমি। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবার মুখ খুলেছেন তিনি।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন রুমি। এই আলাপকালে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান এবং তার মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মাদ্রাসায় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা লুটের যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তা সরাসরি অস্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনে রুমি বলেন, ‘আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছি, সেটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যাচাই করা হোক। মাদ্রাসায় এত টাকা কীভাবে রাখা হয়, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে রুমি জানান, তিনি অনেক আগেই বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন। শাহজালাল রুমি আরও বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আমি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমি তার কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। পরে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই চান না।’
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি সেখানে ভিড় বা মব সৃষ্টি করেছেন এবং ফ্ল্যাট দখলের চেষ্টা করেছেন। এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সন্তানের বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আমি নাকি মব সৃষ্টি করেছি এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছি। আমি কেন মব সৃষ্টি করব? আমি তো একজন বাবা হিসেবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে গিয়েছিলাম।’
মাদ্রাসায় ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলে রুমি জানান, সেখানে একটি ছোট কাচের গ্লাস ভেঙেছে, তবে তা ইচ্ছাকৃত ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, এর ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব। তবে শিক্ষক আসার আগেই গ্লাসটি ভেঙে যায়। ওই সময়ের ভিডিও রেকর্ডও রয়েছে।’
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, তার লড়াই কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা আলেম সমাজের বিরুদ্ধে নয়। রুমি বলেন, ‘আমি মাদ্রাসা বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নন। দ্বীনি শিক্ষার জন্যই মেয়েকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু সেখানে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আমি উদ্বিগ্ন। আমি ইসলাম বা প্রকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলছি না। যারা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং সত্য আড়াল করার চেষ্টা করে, আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি।’
আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন যদি মনে করে আমি অপরাধী, তাহলে আইন অনুযায়ী যে শাস্তি হবে, তা মেনে নেব। আইনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি মামলায় লড়ব। তবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার চাই।’
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া এই বাবা জানান, ঘটনার পর থেকে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ তাকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। দেশবাসীর প্রতি আবেগঘন আবেদন জানিয়ে রুমি বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে যে ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, তা যদি আপনাদের নিজের সন্তানের সঙ্গে ঘটত, তাহলে আপনারা কি মেনে নিতে পারতেন? আমি আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই।’
এদিকে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পৃথক আরেকটি অভিযোগ জমা দিয়েছে।
পারস্পরিক হুমকির বিষয়ে ওসি আরিফুর রহমান জানান, মৌখিকভাবে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।