গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় শাহজালাল রুমি নামের এক অভিভাবক এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা চুরির অভিযোগে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা চুরির অভিযোগে টঙ্গী শাহজালাল রুমিসহ অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করে। এছাড়া মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের ওপর মারধরের প্রতিবাদে ওই দিন বিকেলে টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডে মাদ্রাসার নিজস্ব ভবনের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এর আগে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে আসামি করে শিশুটির বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় (উত্যক্তকরণ) মামলা দায়ের করেন।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান ঘটনার বিষয়ে জানান, প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগে শিশুটির বাবার দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় (উত্যক্তকরণ) মামলা নেওয়া হয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।
ওসি আরও জানান, এছাড়া মাদ্রাসায় বহিরাগতদের নিয়ে অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, নারী শিক্ষকসহ অন্যদের মারধর ও নগদ ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মামলার এজাহার ও মাদ্রাসা সূত্র জানায়, ঘটনার দিন অভিযুক্ত অভিভাবক শাহজালাল রুমিসহ (৩০) ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগত লোক সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসায় প্রবেশ করেন। তারা অধ্যক্ষের কক্ষের কাচ ও বৈদ্যুতিক বোর্ড ভেঙে তাণ্ডব চালায়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে ছাত্রীকে ‘ব্যাড টাচের’ অভিযোগে ভারি স্টেপলার দিয়ে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করা হয় এবং পরনের পোশাক ছিঁড়ে মারধর করা হয়। বাধা দিতে গেলে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকা, উপাধ্যক্ষ এবং নিরাপত্তাপ্রহরী দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারীকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। এ সময় ড্রয়ারে জমি কেনার জন্য রাখা নগদ ১৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এই তাণ্ডবের ভিডিও চিত্র মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে অধ্যক্ষের দাবি।
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরী বলেন, “অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন বর্তমানে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। তিনি প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য খণ্ডকালীন ক্লাস নিতেন। অথচ তাকে উপাধ্যক্ষ বানিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে থাকায় তিনি মাদ্রাসায় ছিলেন না। বহিরাগতদের এনে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে এবং জমি কেনার গচ্ছিত ১৭ লাখ টাকা লুটের প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে।”
এদিকে অভিযুক্ত অভিভাবক শাহজালাল রুমির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি বহিরাগতদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এই মব সৃষ্টি ও তাণ্ডব চালিয়েছেন বলে স্থানীয় একটি পক্ষ দাবি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অধক্ষ্য হেদায়েত উল্লাহ আজাদী, মাওলানা আব্দুল মমিন, মাওলানা আব্দুর রহিম, মাওলানা আমিরুল ইসলাম এবং মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আলমাছ হোসেনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, যৌন নিপীড়নের যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। তবে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষককে মারধর কিংবা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এর আগে ‘শানে সাহাবা খতিব ফাউন্ডেশন’সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতারাও মব কালচারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।