মাদারীপুরের কালকিনিতে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এই গুরুতর ঘটনার পর থানায় এজাহার দায়ের করলেও অভিযুক্তের হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার। তাদের অভিযোগ, বিচার চাওয়ার পরিবর্তে উল্টো জমি সংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। ঘটনার বেশ কিছু দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হননি।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি অনুযায়ী, একই এলাকার হাবিবুর রহমান সিকদার ওরফে হাবুল সিকদার চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে তার ঘরে নিয়ে যান এবং সেখানে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ অক্টোবর কালকিনি থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন শিশুটির মা। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত হাবিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা এলাকার পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত হাবিবুর রহমানের পরিবার থেকে শিশুটির বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে জমি সংক্রান্ত মামলা করা হয়।

শিশুটির মায়ের দেওয়া এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে কালকিনি উপজেলার মধ্য সাহেবরামপুর এলাকায় বাড়ির সামনের পাকা রাস্তা থেকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাবিবুর রহমান শিশুটিকে তার বসতঘরে নিয়ে যান। সেখানে ঘরের সামনের কক্ষের একটি খাটের ওপর শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করা হয়। মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে অভিযুক্তের বাড়ির কাছে পৌঁছে মা ঘরের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পান। ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে তিনি শিশুটিকে অভিযুক্তের সঙ্গে দেখতে পান। এসময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান।

ঘটনার পর শিশুটির কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রতিকার চান। তবে সেখান থেকে প্রত্যাশিত সমাধান না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ৬ অক্টোবর এজাহার দাখিল করেন। পরিবারের দাবি, যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগে মামলা করার পর তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে একটি জমি সংক্রান্ত মামলা করা হয়েছে। তারা আরও জানান, সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে অভিযুক্ত পক্ষের সঙ্গে তাদের আগে কোনো বিরোধ ছিল না।

শিশুটির মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার নিষ্পাপ বাচ্চাকে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে এভাবে খারাপ কাজ করার চেষ্টা করবে, কখনো ভাবতে পারিনি। তারা অনেক ক্ষমতাশালী, টাকাপয়সা বেশি। আমরা বিচার চাইতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু বিচার পাইনি। আমি আমার মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনার বিচার চাই। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুর সঙ্গে কেউ এমন করার সাহস না পায়।”

তিনি আরও জানান, ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।

শিশুটির বাবা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, দিন এনে দিন খাই। তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা আমাদের জন্য কঠিন। মামলা করার কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ আসামিকে ধরতে পারেনি বলে আমাদের অভিযোগ। উল্টো অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় আমাকেও আসামি করা হয়েছে। যেখানে মেয়ের বিচার পাওয়ার জন্য থানায় গিয়েছিলাম, এখন আমি মামলার আসামি।”

স্থানীয় বাসিন্দা সালাম হাওলাদার, রুবেল সিকদার, আলমার শিকদার, আলমগীর শিকদার ও বেলায়েত মাতব্বরসহ অনেকের অভিযোগ, অভিযুক্ত পক্ষ আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারটিকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের দেওয়া অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, এমনকি হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তের বিচারের দাবিতে গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাহেবরামপুর ইউনিয়নের মধ্যেরচর সাহেবরামপুর গ্রামে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এতে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজিত জনতা হাবিবুর রহমানের বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং পরে সেখানে অগ্নিসংযোগ করে, যার ফলে এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান সিকদার ওরফে হাবুল সিকদারের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম বলেন, “শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরাও গত ৬ অক্টোবর বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে জমিসংক্রান্ত মামলা করেছি।”

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহুরুল আলম জানান, “অভিযোগ পেয়েছি। মামলার তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”