বয়স বাড়ার সাথে সাথে চেহারায় বলিরেখা বা বয়সের ছাপ আসা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মনে সব সময়ই এক ধরণের দুশ্চিন্তা কাজ করে। আমরা প্রত্যেকেই চাই দীর্ঘ সময় ধরে তারুণ্য ধরে রাখতে এবং সুন্দর হয়ে থাকতে।
অনেকেই এই লক্ষ্য অর্জনে বাজার থেকে বিভিন্ন ধরণের অ্যান্টি-এজিং ক্রিম, সিরাম কিংবা ফেসপ্যাক কিনে মুখে ব্যবহার করেন। কিন্তু আপনার ত্বক বাইরে থেকে কতটা সুন্দর ও সতেজ দেখাবে, তা মূলত নির্ভর করে আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কী ধরণের খাবার থাকছে তার ওপর।
প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ধুলাবালি, সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি এবং প্রচণ্ড গরম ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর পাশাপাশি বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকের কোলাজেন নামক প্রোটিনের পরিমাণ কমতে থাকে, যা ত্বককে টানটান ও শক্ত রাখতে সাহায্য করে। কোলাজেন কমে যাওয়ার ফলে ত্বক ঢিলে হয়ে যায় এবং বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে সঠিক পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে কোনো রাসায়নিকের সাহায্য ছাড়াই ভেতর থেকে ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখা সম্ভব। সতেজ ও উজ্জ্বল ত্বক পেতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যে খাবারগুলো রাখা প্রয়োজন, তা নিচে আলোচনা করা হলো—
ফল ও শাকসবজি
আপনার খাবারের প্লেটে যত বেশি রঙের বৈচিত্র্য থাকবে, ত্বক সতেজ থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। তাই প্রচুর পরিমাণে রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত। এসব খাবারে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা পরিবেশ দূষণ ও সূর্যের আলোর কারণে ত্বকের যে ক্ষতি হয়, তা রোধ করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
গাজর, টমেটো ও ক্যাপসিকাম: এই সবজিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ‘ক্যারোটিনয়েড’ থাকে। এগুলো শরীরে জমা হয়ে সূর্য ও দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে ভেতর থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
ভেতর থেকেই সানস্ক্রিনের কাজ করে: বাইরে বের হওয়ার সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার করা প্রয়োজন, তবে প্রতিদিন রঙিন সবজি খেলে তা ত্বককে ক্ষতিকর সূর্যরশ্মি থেকে রক্ষা করতে পারে। এর ফলে শরীর ভেতর থেকে সারা বছর একটি প্রাকৃতিক সানপ্রোটেকশন বা রোদের সুরক্ষা পেয়ে থাকে।
ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল রাখা: এই সবজিগুলো সেবনের ফলে ত্বকে ‘হায়ালুরোনিক অ্যাসিড’ তৈরি হয়, যা ত্বককে টানটান ও মসৃণ রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে মুখে একটি সুন্দর ন্যাচারাল গ্লো বা উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে।
যেভাবে সবজি খেলে ভালো ফল পাবেন
সবজি যদি অতিরিক্ত তেল ও মসলা দিয়ে রান্না করা হয়, তবে তার গুণাগুণ খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই সবজি সেদ্ধ করে বা স্টিম করে খাওয়া সবচেয়ে ভালো। এছাড়া হালকা অলিভ অয়েল দিয়ে ভেজেও নেওয়া যেতে পারে।
টমেটো বা গাজরের সালাদ তৈরির সময় সামান্য অলিভ অয়েল মিশিয়ে নিলে শরীর সবজির পুষ্টি উপাদানগুলো সহজেই শোষণ করতে পারে। তবে কিছু ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৩-৪ দিন পরিমাণমতো (এক কাপের কম) আম খেলে বয়সের ছাপ ও বলিরেখা কমে। কিন্তু প্রতিদিন অতিরিক্ত আম খেলে এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনি উল্টো ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। তাই আম পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
লেবু, কমলা বা আমে থাকা ভিটামিন সি ত্বকের কালো দাগছোপ দূর করতে এবং কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে। তবে মনে রাখতে হবে, একদিন ফল খেলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না; এর জন্য প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা উপকারি চর্বি
সাধারণত ফ্যাট বা চর্বির কথা শুনলে আমরা খারাপ কোলেস্টেরলের কথা চিন্তা করি। তবে সব ফ্যাট ক্ষতিকর নয়। কিছু ভালো ফ্যাট ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
বাদাম ও বীজ: কাঠবাদাম, আখরোট বা বিভিন্ন বীজ জাতীয় খাবারে প্রচুর ভিটামিন ই এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে। নিয়মিত হালকা নাস্তা হিসেবে কিছু কাঠবাদাম খেলে ত্বকে বলিরেখা পড়ার গতি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
সামুদ্রিক মাছ: সামুদ্রিক তেলযুক্ত মাছ যেমন— স্যামন, সার্ডিন বা ম্যাকেরেল মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এটি ত্বকের জ্বালা-পোড়া বা অ্যালার্জির সমস্যা কমায় এবং রোদ থেকে ত্বককে রক্ষা করে। সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি তেলযুক্ত নদীর মাছও খাওয়া যেতে পারে।
ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ নিয়ে করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো সূর্যের আলোর প্রতি ত্বকের সংবেদনশীলতা কমাতে পারে এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। তৈলাক্ত মাছ ত্বকে বিদ্যমান কোলাজেন বজায় রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
অন্ত্রের জন্য উপকারি খাবার ত্বককেও ভালো রাখে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের পেটের ভেতরের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তার ইতিবাচক প্রভাব চেহারায়ও পড়ে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গাট-স্কিন এক্সিস’ বলা হয়।
আমরা যখন শাকসবজি, ডাল, শস্যদানা বা বিভিন্ন ফলমূল খাই, তখন আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো কিছু উপকারি উপাদান তৈরি করে। এগুলোর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাগুণ রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ত্বকে পৌঁছায়। ফলে ত্বকে সোরিয়াসিসের মতো জটিল সমস্যা কমে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ঘুম ভালো হয়।
দই ও ফারমেন্টেড খাবার: চিনি ছাড়া টকদই বা ঘরে তৈরি দই নিয়মিত খেলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়। পেট পরিষ্কার ও সুস্থ থাকলে ত্বকও নিজে থেকেই ঝলমলে ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডায়েট চার্ট তৈরি করুন। পাশাপাশি সারাদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। ত্বক স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সতেজ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পানের কোনো বিকল্প নেই।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই যে ৬০ বছর বয়সে এসে ৩০ বছরের তরুণ মনে হবে, তা সম্ভব নয়। তবে বয়স যাই হোক না কেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে আপনার ত্বক বহুবছর টানটান, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সতেজ রাখা সম্ভব। তাই ত্বক ভালো রাখতে খাদ্যতালিকায় রঙিন সবজি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, বাদাম এবং প্রচুর পানি যোগ করুন।
সূত্র: বিবিসি