নিখুঁত, সুন্দর ও উজ্জ্বল চেহারা আমরা সবাই চাই। কী করলে ত্বকে বয়সের ছাপ পড়বে না, ত্বক টানটান থাকবে এবং উজ্জ্বল দেখাবে- এ নিয়ে আমাদের প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। সুন্দর ত্বক আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে নিস্তেজ বা শুষ্ক ত্বক জীবনে নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে ত্বকের যত্ন নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি ত্বক উজ্জ্বল রাখাও জরুরি।
সুন্দর ও স্বাস্থ্যজ্জ্বল ত্বক পেতে হলে বাহ্যিকভাবে ত্বকের যত্ন নেয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো খাবারের দিকে নজর দেয়া। পুষ্টিকর খাবার ভেতর থেকেই ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে।
চলুন ত্বক উজ্জ্বল রাখার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-
ত্বকের উজ্জ্বলতায় ঘরোয়া টোটকা
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে খুব জটিল কিছু না ভেবে প্রথমেই হাতের কাছের জিনিসের দিকে নজর দিন। আপনার হাতের কাছে এবং রান্নাঘরেই এমন অনেক জিনিস রয়েছে যা ত্বক উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। যেমন-
হলুদ: রূপচর্চায় প্রাচীনকাল থেকেই হলুদ ব্যবহার হয়ে আসছে। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা মেটাতে হলুদ খুবই কার্যকরী। নিয়মিত হলুদ ব্যবহার করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। তাই সপ্তাহে এক থেকে দু’দিন কাঁচা হলুদ বেটে লাগান।
টমেটো: অনেক সময়ই স্যান ট্য়ানের জন্য় ত্বক কালো হয়ে যায়। আর এই সান ট্যানের সমস্যা মেটাতে সাহায্য করে টমেটো। এতে থাকা লাইকোপিন ত্বকের ট্যান তুলে ত্বককে ঝকঝকে করে দেয়।
বেসন: ত্বক পরিষ্কার করতে বেসন বেশ ভালো কাজ করে। তবে যাদের ত্বক অনেক বেশি শুষ্ক, তারা শুধু বেসন ব্যবহার করবেন না। এতে কয়েক ফোঁটা মধু ও অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে মুখে লাগান। কয়েক সপ্তাহেই ফল দেখতে পাবেন।
টকদই: এ ছাড়া ত্বকে উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যবহার করতে পারেন টকদইও। এতে ত্বক পরিষ্কার হয়। টকদই, বেসন, মধু একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান।
অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরাও ত্বকের ট্যান দূর করে উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। রোদ থেকে ফিরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে নিন। তাৎক্ষণিকভাবেই ত্বক উজ্জ্বল দেখাবে।
ত্বক উজ্জ্বল করতে যেসব খাবার খাবেন
শুধু রূপচর্চা করলেই হবে না। ত্বক যাতে ভেতর থেকেই উজ্জ্বল দেখায় সে জন্য খাবারের ব্যাপারে বেশ সচেতন হতে হবে। আপনি কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন আপনার চেহারাতেও তার প্রভাব পড়ে। চলুন জেনে নিই উজ্জ্বল ত্বক পেতে খাদ্যতালিকায় কোন খাবারগুলো রাখবেন-
গ্রিন টি: গ্রিন টি এখন শুধু পানীয় নয়, এটি রূপচর্চার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এটি শরীরে জমে থাকা টক্সিন বের করে ত্বককে ভেতর থেকে উজ্জ্বল করে তোলে। এ ছাড়া ত্বকের দাগ–ছোপ, কাটা দাগ, লালচে ভাব কমাতেও সাহায্য করে। ত্বককে স্বাস্থ্যবান ও উজ্জ্বল করতে গ্রিন টি দারুণ কাজ করে।
টমেটো: টমেটো মুখে লাগালে যেমন উপকার পাবেন, তেমনি খেলেও বেশ ভালো কাজ হবে। টমেটোতে লাইসোপিন নামক অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে, যা ত্বকের বিভিন্ন দাগ, বলিরেখা ও শুষ্কভাব দূর করে ত্বককে মসৃণ করে। ত্বকের লালচে ভাব কাটাতে সাহায্য করে। টমেটো প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবেও কাজ করে।
গাজর: গাজরে থাকে ভিটামিন এ, যা ত্বক টানটান রাখতে সাহায্য করে। ফলে ত্বক মসৃণ থাকে। এটি তৈলাক্ত ত্বকের জন্য খুব উপকারী।
অলিভ অয়েল: সয়াবিন তেলের পরিবর্তে রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন। এটি শরীরের জন্য যেমন ভালো, তেমনি ত্বকের জন্যও বেশ উপকারী।
ডার্ক চকলেট: ডার্ক চকলেটের অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও পুষ্টি উপাদান ত্বক সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখে। সে জন্য মাঝে মাঝে ডার্ক চকলেট খেতে পারেন। তবে ৭০ শতাংশের কম ক্যাকো আছে, এমন চকলেট না খাওয়াই ভালো। কারণ, যে চকলেটে ক্যাকো বেশি, তাতে চিনি কম থাকে।
সতেজ শাকসবজি: ত্বকের উজ্জ্বলতায় বেশি বেশি করে সতেজ শাকসবজি ও ফলমূল খেতে পারেন। তেল-মসলা একদম কম খাওয়ার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া খাবারের তালিকায় শর্করার পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন বেশি রাখুন।
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যায়াম
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যায়ামের কথা শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন। ব্যায়াম শুধু শরীরই ফিট রাখে না, ত্বক সুন্দর ও উজ্জ্বল রাখতেও দারুণ কাজ করে। প্রাকৃতিকভাবে ত্বককে সুন্দর রাখতে কিছু সাধারণ ব্যায়াম করতে পারেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন ব্যায়াম ত্বকের জন্য কেমন উপকারী-
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
গভীরভাবে শ্বাস নিলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায়। এতে ত্বকের কোষগুলো সতেজ হয় এবং মুখের ফোলাভাব কমে। ত্বকে বয়সের ছাপ দেরিতে পড়তেও এটি বেশ কার্যকরী। মানসিক চাপ ত্বকের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয় এবং ব্রণের সমস্যাও বাড়ায়।
প্রতিদিন অল্প কিছু সময় শান্ত হয়ে বসে গভীরভাবে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। এতে মানসিক চাপ কমবে, ফলে ব্রণ বা অ্যালার্জির সমস্যাও দূর হবে। শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমিয়ে ত্বক পরিষ্কার ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
যোগব্যায়াম বা ইয়োগা
যোগব্যায়াম শরীরের রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। রক্ত চলাচল ভালো হলে ত্বকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছায়, যা মুখে এক চমৎকার প্রাকৃতিক গ্লো এনে দেয়। নিয়মিত যোগব্যায়ামের পাশাপাশি কিছু ফেস ইয়োগাও করতে পারেন।
সাধারণ শরীরচর্চা বা অ্যারোবিক্স
হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা কিংবা সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়ামগুলো শরীরের জন্য যেমন ভালো, তেমনি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে। এগুলো ত্বকের কোলাজেন তৈরি বাড়ায়, যা ত্বককে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখে।
হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা ঝটপট কসরত
কম সময়ে দ্রুত শক্তি খরচ হয় এমন ব্যায়াম (যেমন- এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লাফানো, স্কোয়াট করা ইত্যাদি) ত্বকের কোষগুলোকে তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের নমনীয়তা বাড়ায় এবং সহজে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না।
ওয়েট লিফটিং বা স্ট্রেংথ ট্রেনিং
সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আধা ঘণ্টা করে হালকা ওজন তোলার বা পেশি মজবুত করার ব্যায়াম করলে ত্বকের চামড়া কুঁচকে যাওয়ার সমস্যা অনেক কমে যায়। এটি ত্বকের ভেতরের স্তরকে ঘন ও শক্ত করে, ফলে বয়স বাড়লেও ত্বক সহজে বুড়িয়ে যায় না।
পুষ্টিকর খাবার আর ত্বকের যত্নের পাশাপাশি এই হালকা ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করলে ত্বকের লাবণ্য বাড়বে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সকালের কিছু অভ্যাস
সারাদিনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং পরিশ্রমের কারণে অনেক সময়েই ত্বক ম্লান দেখায়, উজ্জ্বলতা কমে। সুস্থ ত্বক পেতে আসলে বিশেষ কিছু করার দরকার নেই। বরং প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলতে পারেন।
লেবু পানি: শরীর ভিতর থেকে পরিষ্কার রোগমুক্ত রাখতে লেবু পানির বিকল্প নেই লেবুর। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস লেবু মেশানো হালকা গরম পানি খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন। লেবুর রসে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডান্ট আর ভিটামিন সি থাকায় এটি ত্বকে বাড়তি উজ্জ্বলতা এনে দেবে।
হালকা ব্যায়াম করুন: সকালে উঠে সাধারণ কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন, বাগানে বা বাড়ির ছাদে কয়েক মিনিট হাঁটুন। সকালে ব্যায়াম করলে শরীর সারাদিন চাঙ্গা থাকে, তা ছাড়া ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে।
মুখ ধুয়ে নিন: ঘুমানোর সময় সারা রাত ধরে মুখে তেল ময়লা জমতে থাকে। সকালে উঠে কোমল ফেসওয়াশ দিয়ে মুখটা ধুয়ে ফেলুন, তারপর ফেস সিরাম বা হালকা ময়শ্চারাইজার মেখে নিন। এতে সারাদিন ত্বক সতেজ লাগবে।
ময়শ্চারাইজার ব্যবহার: ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং ত্বক মসৃণ রাখতে একটা ভালেো মানের ময়শ্চারাইজার অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। যে ময়শ্চারাইজারটা রোজ মাখছেন সেটি আপনার ত্বকের উপযোগী কিনা সেটা আগে জানা দরকার। সকালে ময়শ্চারাইজারের পরই সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
মুখ এক্সফোলিয়েট করুন: ত্বকের উপরে মৃত কোষ জমে গেলে মুখ বিবর্ণ অনুজ্জ্বল দেখায়। সপ্তাহে অন্তত দু'বার ঘরোয়া স্ক্রাব দিয়ে মুখ এক্সফোলিয়েট করতে ভুলবেন না।
খাদ্যতালিকায় ফল আর সবজি: প্রতিদিন সকালের নাশতায় যে কোনো ফল বা সবজি রাখার চেষ্টা করুন। গোটা ফল বা ফলের রস খেতে পারেন বা শাকসবজি পিষে গ্রিন স্মুদি বা জুস বানিয়ে খেতে পারেন। সকালে এরকম একটি পানীয় শরীরের সিস্টেমকে ভিতর থেকে পরিষ্কার রাখবে। সেই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর ত্বক হয়ে উঠবে উজ্জ্বল।
অল্প বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করবেন যেভাবে
ত্বক উজ্জ্বল রাখার পাশাপাশি ত্বকে যেন বয়সের ছাপ না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি অল্প বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে নানা ভেষজ উপাদান ব্যবহার করতে পারেন। যেমন-
ত্রিফলা
ত্বকে বয়সের ছাপ কমানোর জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ত্রিফলা। এর জন্য আধা গ্লাস হালকা গরম পানিতে ত্রিফলার গুঁড়া মিশিয়ে খেতে পারেন। সঙ্গে ভালোভাবে এক চামচ মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। ঘুম থেকে ওঠার পর খালি পেটে এই মিশ্রণ খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে। ব্রণের সমস্যাও কমবে।
ঘি
ত্বকের নানারকম সমস্যার সমাধান হতে পারে ঘি। এটি ত্বকের শুষ্কতা দূর করার পাশাপাশি ঠোঁটফাটা, গোড়ালি ফাটা কমাতেও বেশ কার্যকর। রান্নায় তেলের পরিবর্তে পরিমাণ মতো ঘি ব্যবহার করলে ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া রোধ করা যায়।
এ ছাড়াও ত্বকের সৌন্দর্য ঠিক রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অশ্বগন্ধা, আমলকী, গুলঞ্চ রাখতে পারেন। চাইলে এই তিনটি গুঁড়ো মিশিয়ে দই ও মধু দিয়ে ফেসপ্যাক ব্যবহার করে মাখতে পারেন। তাহলেও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে এবং অল্প বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করতে পারবেন।
অনেকেই সুন্দর ও উজ্জ্বল ত্বক পেতে বাজারের বিভিন্ন ক্রিম ব্যবহার করেন। এই কৃত্রিম পদ্ধতি আপনার ত্বককে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল করবে ঠিকই, কিন্তু ভেতর থেকে প্রকৃতিকভাবে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিনের জীবনযাপনের অভ্যাসে পরিবর্তন আনার কোনো বিখল্প নেই।