অনেকেরই প্রচলিত ধারণা যে, ঠোঁটের কালচে ভাব কেবল বংশগত বা জিনগত কারণেই হয়ে থাকে। তবে প্রকৃত বাস্তবতা হলো, জিনগত প্রভাবের চেয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অসচেতনতা এবং অযত্নের কারণেই ঠোঁটের রং বেশি গাঢ় ও কালচে হয়ে যায়। ঠোঁটের নিজস্ব প্রাকৃতিক রং কেন হারিয়ে যায় এবং কীভাবে ঘরোয়া উপায়ে সেই সজীবতা পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ বিউটি কেয়ারের রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি। প্রতিবেদনটি লিখেছেন আনিকা তায়্যিবা।

শারমিন কচির মতে, আমাদের মুখমণ্ডলের ত্বকের তুলনায় ঠোঁটের নিজস্ব পিগমেন্ট বা প্রাকৃতিক রং সাধারণত কিছুটা গাঢ় হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ফরসা ত্বকের মানুষের ঠোঁটের রং সামান্য গোলাপি বা হালকা বাদামি আভাযুক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে যখন এই রং আরও গাঢ় ও ট্যানড হয়ে যায়, তখনই তা কালচে দেখায়। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো—

আর্দ্রতার অভাব: শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে ঠোঁট অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে পড়ে, যার ফলে ঠোঁটের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে কালচে ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রোদের অতিবেগুনি রশ্মি: কপাল বা নাকের মতো ঠোঁটেও সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে। রোদের ক্ষতিকর ইউভি রশ্মির প্রভাবে ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে কালচে ছোপ তৈরি হয়।

প্রসাধনীর অতিরিক্ত ব্যবহার: নিয়মিত রাসায়নিক উপাদানে তৈরি লিপস্টিক, লিপলাইনার বা টিন্টের ব্যবহার ঠোঁটের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনে।

ঠোঁটের চামড়া ছেঁড়ার বদভ্যাস: দাঁত বা আঙুল দিয়ে ঠোঁটের শুকনা চামড়া টেনে তোলার বাজে অভ্যাস অনেকেরই থাকে। এর ফলে ঠোঁটের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে কালচে দাগ বসে যায়।

অ্যালার্জি ও অন্যান্য কারণ: নির্দিষ্ট কোনো প্রসাধনী বা উপাদানের প্রতি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার কারণেও ঠোঁট কালচে হতে পারে।

বর্তমান সময়ে ঠোঁটের কালচে দাগ দ্রুত দূর করতে অনেকেই কসমেটিক সার্জারির কথা চিন্তা করেন। তবে শারমিন কচি মনে করেন, সার্জারির মাধ্যমে পাওয়া পরিবর্তন খুবই ক্ষণস্থায়ী; বরং যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভেষজ ও প্রাকৃতিক যত্নই ঠোঁটের স্বাস্থ্য ও রং ফেরাতে সবচেয়ে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখে।

সহজ কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করেই নিয়মিত ঠোঁটের যত্ন নেওয়া সম্ভব। যেমন:

গোলাপের পাপড়ি ও গ্লিসারিন: তাজা গোলাপের কয়েকটি পাপড়ি বেটে তার সঙ্গে সামান্য গ্লিসারিন মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করুন। এক্ষেত্রে গোলাপ ফুলটি লাল বা গোলাপি রঙের হলে অধিক কার্যকর হয়। এই মিশ্রণটি ঠোঁটে মেখে রাখলে ঠোঁট নরম হয় এবং প্রাকৃতিক গোলাপি আভা ফিরে পেতে সাহায্য করে।

মৃদু স্ক্রাবিং: ঠোঁটের মরা চামড়া বা ডেড সেলস দূর করতে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হালকা স্ক্রাব করা জরুরি। আধা চা–চামচ মধুর সঙ্গে সামান্য চিনি মিশিয়ে খুব আলতো হাতে ঠোঁটে ঘষে নিতে হবে। মধু না থাকলে চিনি ও কয়েক ফোঁটা তেলের (নারকেল বা জলপাই তেল) মিশ্রণও ব্যবহার করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ঠোঁটের চামড়া অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় কোনোভাবেই জোরে ঘষাঘষি করা যাবে না।

লিপ সানস্ক্রিনের সুরক্ষা: বাইরে বের হওয়ার আগে অন্তত এসপিএফ ৩০ প্লাসযুক্ত লিপ সানস্ক্রিন বা লিপবাম ব্যবহার করুন। এটি রোদের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ঠোঁটের ত্বককে সুরক্ষিত রাখবে।

রাতের বিশেষ পরিচর্যা: রাতে ঘুমানোর আগে মুখ ধোয়ার পাশাপাশি ঠোঁটের মেকআপও ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ঠোঁটে ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার, লিপবাম বা হাইড্রেটিং লিপ প্যাক লাগিয়ে ঘুমান।

যাঁদের ঠোঁটে কালচে ভাব বা পিগমেন্টেশন বেশি, তাঁরা একটানা ৮ থেকে ১০ দিন অথবা সপ্তাহে নিয়মিত দুই থেকে তিন দিন এই ঘরোয়া যত্ন চালিয়ে যেতে পারেন। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।