অনেকেই লক্ষ্য করেন, কিছু বয়স্ক মানুষ তাঁদের নাতি-নাতনিদের ৬০-৭০ বছর আগের ঘটনাগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শুনিয়ে যান। অথচ তাঁদের চেয়ে অনেক কম বয়সী মানুষ আগের দিন দুপুরে কী খেয়েছিলেন, তা-ই মনে করতে হিমশিম খান। প্রশ্ন জাগে, নির্দিষ্ট কিছু বয়স্ক মানুষের স্মৃতিশক্তি কেন এত প্রখর হয়?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর একদল গবেষক দীর্ঘ সময় ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণা করছেন, যাঁদের বয়স ৮০ বছর ছাড়িয়ে গেলেও স্মৃতিশক্তি তরুণদের মতোই তীক্ষ্ণ। গবেষকেরা এই বিশেষ শ্রেণির মানুষদের অভিহিত করেছেন ‘সুপারএজারস’ হিসেবে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পেছনে কেবল জেনেটিক বা বংশগত কারণ দায়ী নয়। এই গবেষণার আওতায় বিভিন্ন দেশ ও জাতির ১৪২ জন সুপারএজারের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁদের তথ্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে আরও ৮৯ জনের একটি নিয়ন্ত্রণ দলের। এই ‘নিয়ন্ত্রণ দল’ বা কন্ট্রোল গ্রুপে এমন সব বয়স্ক মানুষকে রাখা হয়েছিল, যাঁদের বয়স ৮০ বছরের বেশি এবং স্মৃতিশক্তি বা জ্ঞানীয় সক্ষমতা তাঁদের বয়স অনুযায়ী গড়পড়তা। অর্থাৎ, তাঁরা সুপারএজার ছিলেন না।

গবেষণার ক্ষেত্রে আলঝেইমারস ডিজিজের সাথে সম্পর্কিত জিন এবং পারিবারিক ইতিহাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সুপারএজারদের মধ্যে আলঝেইমারস ডিজিজের বংশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় খুব একটা কম নয়। এর অর্থ হলো, অসাধারণ স্মৃতিশক্তির একমাত্র কারণ বংশগতি—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের দাবি, মস্তিষ্ক ও স্মৃতির দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা বজায় রাখতে জিনের পাশাপাশি জীবনযাপন পদ্ধতি, ব্যক্তিগত আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে এই গবেষণা দলের পর্যবেক্ষণে একটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, প্রায় ৮৩ শতাংশ সুপারএজারই সামাজিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়। তাঁরা বহির্মুখী স্বভাবের এবং নিয়মিত ঘরের বাইরে বের হন। হাঁটাচলা এবং শারীরিক সক্রিয়তার সাথে স্মৃতির বা জ্ঞানীয় সক্ষমতার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, যা তাঁদের স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে অসাধারণভাবে সহায়তা করেছে।

দ্বিতীয়ত, এই সুপারএজাররা তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট। শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকার পাশাপাশি এই সুন্দর ‘সম্পর্ক’ তাঁদের স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণে বড় ভূমিকা পালন করেছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবার, বন্ধু এবং সামাজিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোর সাথে তাঁদের উন্নত জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে গবেষণায় একটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক সামনে এসেছে। সব সুপারএজার যে কঠোর নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন, তা নয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ধূমপান বা মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস থাকা সত্ত্বেও অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষকদের মতে, এমন ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা থাকতে পারে।

সামগ্রিকভাবে এই গবেষণাটি নির্দেশ করে যে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কেমন হবে তা কেবল আমাদের জিন দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং জীবনের বিভিন্ন জৈবিক, আচরণগত এবং সামাজিক বিষয়গুলোও এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।